গত দেড় মাসে কয়েক দফা টানা বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধ ভবদহ অঞ্চলে মানুষের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। আগেই তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি, ঘের, ফসলি খেত, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ ও মন্দির। বাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে কয়েক হাজার পরিবার। বন্ধ হয়ে গেছে রোজগারের সব পথ। ফলে মানুষের ঘরে ঘরে এখন কেবল চাপাকান্না আর হাহাকার। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। যেন হাঁটা-চলার উপায় নেই। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজায় তাদের মুখ মলিন।
গত ২ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। আগামীকাল রবিবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে এ উৎসব শেষ হবে। তবে পূজা উপলক্ষে উৎসবের কোনো আমেজ নেই ভবদহ অঞ্চলের অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ, সুন্দলী, পায়রা ও চলিশিয়া ইউনিয়নের ভুক্তভোগী সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মনে। চারদিকে কেবল অথৈ পানি ও সীমাহীন দুর্ভোগ উৎসবের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে। দু-মুঠো ভাত জোগাড় যেখানে চরম আরধ্য; উৎসব সেখানে বিলাসিতা বলে জানিয়েছেন পানিবন্দি এলাকার মানুষ।
অভয়নগরে উপজেলা পরিষদের তথ্য মতে, অর্ধশতাধিক মন্দির পানিতে তলিয়ে গেছে। পূজা-অর্চনার ন্যূনতম অবস্থা নেই ৩৫টি মন্দিরে। তা ছাড়া পানির কারণে সুন্দলী ইউনিয়নের চারটি ও আন্ধা গ্রামের একটি মন্দিরে কোনো পূজা হচ্ছে না। উপজেলায় এ বছর ১১৪টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন হচ্ছে।
উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের ডহরমশিহাটি গ্রামের বাসিন্দা টুকু মজুমদার বলেন, গত এক মাস ধরে সংসারে আয়-রোজগার বন্ধ। মাছ ধরে তা বিক্রি করে কোনোমতে জীবন বাঁচিয়ে রেখেছি। পূজোর উৎসব আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য না। উপজেলার চলিশিয়া ইউনিয়নের বলারাবাদ গ্রামের বাসিন্দা উশা রানি বলেন, আমাদের কোনো পূজো নেই। পূজোর সময় ছেলেমেয়েদের নতুন জামা-কাপড় কিনে দিতে পারিনি। পানিও সরছে না। আমাদের কষ্ট দেখার আসলে কেউ নেই।
অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়দেব চক্রবর্তী বলেন, প্রতিবছর সরকারি যে বাজেট থাকে দুর্গাপূজার জন্য তা এরই মধ্যে প্রদান করা হয়েছে। তা ছাড়া যারা একান্ত অসহায় তারা যদি কোনো সাহায্যের জন্য আবেদন করেন, আমরা তাদের সহায়তা করব।
শুধু অভয়নগর উপজেলা নয়, প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে যশোরের ভবদহ এলাকাসহ আরও দুই উপজেলা মণিরামপুর ও কেশবপুরে। এখানেও দুর্গোৎসবের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। একটানা বৃষ্টিপাতে তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি, ঘের, ফসলি খেত, স্কুল, কলেজ, মাদ্রসা, মসজিদ ও মন্দির।
কেশবপুর উপজেলার পাঁজিয়া গ্রামের সঞ্জয় চৌধুরী জানান, এবার জলাবদ্ধতার কারণে উপজেলায় পূজা মণ্ডবের সংখ্যা কমে গেছে। কয়েক হাজার পরিবারের বাড়িতে পানি উঠে গেছে। যেখানে বসবাস করা দায় হয়ে পড়েছে, সেখানে পূজা-পার্বণ হবে কীভাবে।
পূজা উদযাপন পরিষদ যশোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ জানান, গতবছর যশোরে ৭৩৩ পূজা মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ বছর ৮১টি কমে পূজা হচ্ছে ৬৫২টিতে। পূজা মণ্ডপের সংখ্যা কমার জন্য তিনি তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুরে জলাবদ্ধতায় মন্দির ও পূজা মণ্ডবের স্থানে পানি উঠে যাওয়ার কথা বলেন। পাশাপাশি আর্থিকসংকট, সম্প্রতি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জনমনে সৃষ্ট অস্থিরতার কারণে এবার পূজা কম হচ্ছে বলে জানান।
পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে পূজা উদযাপন পরিষদ একসঙ্গে কাজ করছে। লালদীঘিরপাড় হরিসভা মন্দিরে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিটি মন্দির ও মণ্ডপের কার্যক্রম সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। এ ছাড়া বরাবরের মতো পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় লালদীঘিতে প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যবস্থা থাকছে।