কুমিল্লা নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ শাসনগাছা রেলওয়ে ওভারপাস। স্থানীয়ভাবে ফ্লাইওভার নামে পরিচিত এই ওভারপাসে ৬৪টি ল্যাম্পপোস্ট রয়েছে। কিন্তু এগুলোর একটিও জ্বলে না! সন্ধ্যার পর পুরো ওভারপাসজুড়ে নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। প্রায়ই ঘটে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা।
গত বছরের আগস্ট থেকে বাতিগুলো বিকল হয়ে থাকলেও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ওই পথে চলাচলকারীদের পাশাপাশি পরিবহন মালিক-চালকরা দীর্ঘদিন ধরে ল্যাম্পপোস্টগুলো চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে সব কিছু আটকে আছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ এবং সিটি করপোরেশনের একে অন্যকে দোষারোপ করার মধ্যে।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, ৬৩১ দশমিক ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই ওভারপাসটি ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল উদ্বোধন করা হয়। নির্মাণ ব্যয় হয় ৯৪ কোটি ছয় লাখ টাকা। এতে কুমিল্লা নগরীর পশ্চিম অংশ দিয়ে শহরে প্রবেশ অনেকটা সহজ হয়ে ওঠে। ওভারপাসের নিচের সড়কে কিছুটা যানজট থাকলেও এর ওপর দিয়ে নিমিষেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া যায়। গত প্রায় এক বছর ধরে ওভারপাসের ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলো একে একে বন্ধ হতে থাকে। আর আগস্টের পর থেকে সব বাতিই অকেজো হয়ে যায়। ফলে রাত বাড়লেই পুরো ওভারপাসটি ঘুট ঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। ভুতুড়ে পরিবেশ হওয়ায় রাতের বেলায় মাদকাসক্তদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়ে। এতে অনিরাপদ হয়ে উঠেছে যাত্রীদের চলাচল।
যানবাহন চালকরা বলেন, চালুর কয়েক বছর ল্যাম্পপোস্টে বাতি জ্বললেও মাদকাসক্ত ও ছিঁচকে চোর চক্র ওভারপাসে থাকা ল্যাম্পপোস্টের গোড়া ভেঙে ভেতরে থাকা বৈদ্যুতিক তার চুরি করে নিয়ে যায়। এতে আস্তে আস্তে লাইটগুলো বিকল হয়ে পড়ে।
শহরের রেইসকোর্স এলাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে ফ্লাইওভারের ল্যাম্পপোস্টের গোড়ায় একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে বসে থাকতে দেখেছি। ওরা মূলত বৈদ্যুতিক তার চুরি করে নিয়ে যায়।’
গত রবিবার (১২ জানুয়ারি) রাত ৯টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৬৪টি ল্যাম্পপোস্টে বাতি থাকলেও সব বিকল। প্রতিটি ল্যাম্পপোস্টের গোড়া ভেঙে গর্ত তৈরি করা হয়েছে। এ সময় সিলেট থেকে আসা আবুল হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, ‘কান্দিরপাড় যাব। ফ্লাইওভারের গোড়ায় নামার পর দেখি পুরো ফ্লাইওভার অন্ধকার। এখন এটার ওপর দিয়ে যাব কি না ভাবছি। এত অন্ধকারে গেলে ছিনতাই হলে ক্ষতিগ্রস্ত হব।’
ফ্লাইওভারের আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চোর ও মাদকাসক্তরা খুঁটির নিচ থেকে বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়ে গেছে। এ কারণে ল্যাম্পপোস্টের লাইট জ্বলে না। ফ্লাইওভার নজরদারিতে রাখতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও আলো না থাকায় রাতে সেগুলো এক রকম অকেজো হয়ে থাকে। এ নিয়ে কারও মাথাব্যথাও নেই।’
কুমিল্লার এই রেলওয়ে ওভারপাস দিয়ে চলাচল করা সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আমি প্রতিদিন ফ্লাইওভার দিয়ে যাত্রী আনা-নেওয়া করি। আগে রাতেও গাড়ি চালাতাম। এখন ফ্লাইওভারে কোনো বাতি জ্বলে না। তাই সন্ধ্যার মধ্যে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেই। আমি দেখেছি ভবঘুরে ও মাদকাসক্তরা ল্যাম্পের গোড়া খুঁড়ে বৈদ্যুতিক তার কেটে নিয়েছে। আমি গাড়ি থামিয়ে বাধা দিয়েছি। কিন্তু শোনেনি। সব ল্যাম্পের গোড়া থেকে তার চুরি করে নিয়েছে মাদকাসক্তরা। আলো না থাকায় জয়গাটি মাদক সেবনের নিরাপদ পরিবেশ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে গাড়ির হেডলাইটই আমাদের ভরসা।’
কুমিল্লা জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের কার্যকরী সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, ‘শাসনগাছা ফ্লাইওভারের লাইটগুলো সড়ক ও জনপথ বিভাগ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনকে হ্যান্ডওভার করেছে। এটি এখন তারা দেখবে। দীর্ঘদিন এই লাইটগুলো বন্ধ রয়েছে। রাতে যাত্রীরা ছিনতাই ও ডাকাতির শিকার হয়। লাইটগুলো দ্রুত ঠিক করা জরুরি।’
এ বিষয়ে কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকোশলী সুনীতি চাকমা বলেন, ‘ফ্লাইওভারটি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনেরও দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে। ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলো কেন জ্বলে না তা চেক করতে লোক পাঠিয়েছি। দ্রুত ল্যাম্পপোস্টের বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হবে।’
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সামছুল আলম বলেন, ‘ফ্লাইওভার আমাদের না। এটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের। আমরা মাঝেমধ্যে নগরবাসীর স্বার্থে লাইটিং করে দেই। তার পরও যেহেতু বিষয়টি জেনেছি, আমি বিদ্যুতের লোক পাঠিয়ে দেখব সমস্যা কী।’