সরকার-নির্ধারিত ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান পূরণে রাজশাহী খাদ্য অধিদপ্তর এবারও ব্যর্থ হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, মৌসুমের শুরু থেকেই স্থানীয় হাটবাজারগুলোতে ধানের দাম ছিল সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি। তাই কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান-চাল না দিয়ে পাইকারি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন। ফলে বরাবরের মতো এবারও রাজশাহী বিভাগে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে ভাটা পড়েছে।
মিলাররা জানিয়েছেন, বাজারে ধান বিক্রির প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ। সরকারি গুদাম ও বাজারদরের পার্থক্য ১৭০ থেকে ২৭০ টাকা। তাই কম দামে তারা সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে চান না। তবে লাইসেন্স টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে সরকারকে ধান-চাল দিতে হয়। তবে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কাজ চলছে।
খাদ্য বিভাগ সূত্র জানায়, ২০২০-২১ মৌসুমে রাজশাহী বিভাগে আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৯ হাজার ৮৪৫ টন। ওই বছর সংগ্রহ করা হয় ১ হাজার ১০৮ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ১ দশমিক ২২ শতাংশ। ২০২১-২২ মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৩ হাজার ৪০৪ টন। সংগ্রহ করা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৫ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ১২ শতাংশ। ২০২২-২৩ মৌসুমে পুরো বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ৭৬৭ টন। সে বছর সংগ্রহ করা হয় মাত্র ৭ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ।
২০২৩-২৪ মৌসুমে আমন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১ হাজার ৫৫৬ টন। ওই বছর সংগ্রহ করা হয় ৩ হাজার ৪৮২ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ১১ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৫৬ হাজার ৩৫৯ টন আমন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৯৫ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের বেঁধে দেওয়া ১ হাজার ৩২০ টাকা মণ ধানের বিপরীতে কৃষক বাজারে পাচ্ছেন ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। বাজারদর বেশি হওয়ায় কৃষকরা গুদামে আমন ধান দিতে আগ্রহী নন। তানোর উপজেলার কৃষক আকরাম হোসেন বলেন, ‘সরকারের কাছে বিক্রি করার চেয়ে বাইরে বিক্রি করাই ভালো। সরকার দাম দেবে ১ হাজার ৩২০ টাকা আর বাইরে দেড় হাজার টাকার বেশি। তাও আবার বাকিতে কিনবে সরকার। আর বাইরে নগদ।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ঋণ করে ধান চাষ করি। ফলে ধান ওঠামাত্র পাওনাদার চলে আসেন। তাহলে কীভাবে সরকারের কাছে ধান দেব? তাই আমরা বাইরে ধান বিক্রি করি।’
পবার কৃষক আলিমুদ্দিন বলেন, ‘আমরা তো বাইরে বেশি দাম পাচ্ছি। তাহলে লোকসান করে কেন কম দামে সরকারের কাছে দেব? সরকারের কাছে ধান বিক্রি করার চেয়ে খোলা বাজারে বিক্রিতে ঝামেলা কম, দামও বেশি।’
রাজশাহীর এফএম অটোরাইস মিলের মালিক মতিউর রহমান বলেন, ‘সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে চাল সরবরাহ করতে গিয়ে আমরা বিপাকে পড়েছি। লোকসান গুনতে হচ্ছে। কিন্তু লাইসেন্স বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে সরকারকে চাল দিতে হচ্ছে।’
রাজশাহী বিভাগীয় আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাইন উদ্দিন বলেন, ‘বাজারে ধানের দাম বেশি থাকায় কৃষকরা সরকারি গুদামে ধান দিচ্ছেন না। ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার প্রধান ও একমাত্র কারণ এটি। তবে এ বিষয় নিয়ে সরকার কাজ করছে।’