সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সেকৃবি) উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা সামছুজ্জামান ও তার গবেষণা টিমের মাধ্যমে সম্প্রতি দেশের ইলিশ আহরণ, বাজারজাতকরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর একটি জরিপভিত্তিক গবেষণাকর্ম পরিচালিত হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে ইলিশের দাম না কমার অনেক অজানা তথ্য। গবেষণা দলের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ইলিশ আহরণ থেকে শুরু করে বাজারে সরবরাহ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং ইলিশ বাজারজাতকরণে তদারকি সংস্থার দুর্বলতা ও যথাযথ নজরদারির অভাবের কারণে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও দাদনব্যবস্থা ইলিশের দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে জেলে, আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা এবং ভোক্তা পর্যায়ে প্রায় ৩১৭ জন ব্যক্তির ওপর জরিপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, জেলে থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে ইলিশ অন্তত ৪-৫ বার হাত বদল হয়। হাত বদলের প্রতিটি ধাপে মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা মুনাফা যোগ হওয়ায় প্রতি কেজি ইলিশের দাম ৮০০-৯০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। বরিশালে জেলেরা ৮০০-৯০০ গ্রাম সাইজের প্রতি কেজি ইলিশ ৮০০-১০০০ টাকায় বিক্রি করলেও আড়তদাররা সেটা ১০০০-১২০০ টাকায় এবং সর্বশেষে খুচরা বিক্রেতারা সেগুলো ১৬০০-১৭০০ টাকায় বিক্রি করেন। জ্বালানি তেলের দাম, শ্রমিক মজুরি, পরিবহন এবং সংরক্ষণ খরচ বৃদ্ধিও ইলিশের দামের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বরিশাল থেকে ঢাকায় এক ট্রাক ইলিশ পরিবহনে তিন বছর আগে খরচ হতো ১৮-২০ হাজার টাকা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫-৩০ হাজার টাকারও বেশি। বরফ সংরক্ষণ এবং প্যাকেজিং বাবদ প্রতি কেজিতে ১৫০-২০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এ ছাড়া দাদনের কারণে জেলেদেরকে আড়তদারদের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে মাছ বিক্রি করতে হয়। তথ্য উপাত্ত থেকে আরও জানা যায়, অবৈধ পথে ইলিশ পাচার হয়ে যাওয়াও একটি বড় সমস্যা। সাধারণত সমুদ্রপথে সীমান্ত এলাকা দিয়ে এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অন্য মাছের সঙ্গে মিস ডিক্লারেশন দিয়ে রপ্তানির মাধ্যমে ইলিশ পাচার করে থাকে। সেই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময়ে ভারতীয় জেলেদের এদেশের জলসীমা থেকে বিনা বাধায় মাছ ধরার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, কিন্তু ভারতে ১৫ এপ্রিল হতে ১৪ জুন অর্থাৎ জুন-জুলাইয়ের এই সময়টায় ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় মাছ ধরা অব্যাহত রাখে। এর ফলে দেশের জেলেরা নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী সময়েও আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ইলিশ বিপণনের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের প্রভাব বর্তমানে এতটাই শক্তিশালী যে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ঢাকার বাজারে ইলিশের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রেও ইলিশের দাম বেড়ে যায়। এভাবে সিন্ডিকেট ইলিশের ভরা মৌসুমেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। জেলেরা মাছ ধরার মৌসুমে ৪-৫ বার সাগরে যেতে পারলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশগত সমস্যা, অনাবৃষ্টি, সমুদ্রে নিম্নচাপ, জোয়ার ভাটা, ডুবোচর, বালু জমে নদীর মোহনা ভরাটসহ নদীগুলোর নাব্য হারানো, নদী ও সমুদ্রের দূষণ, বাঁধ-সেতুসহ নানা অবকাঠামো ইলিশ মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে এর আহরণ কমে গেছে। এরপরও গত এক দশকে ইলিশের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।
গবেষণা কাজে নিয়োজিত উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মো. আকিমুন হাসান রাফি খবরের কাগজকে বলনে, মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী যদিও ইলিশ বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ শতাংশ যোগান দেয়, কিন্তু, যথাযথ বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যর কারণে সাধারণ মানুষের পাতে ইলিশ পৌঁছা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে জেলেদের সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার খরচ কমিয়ে আনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা। ডিজেলের খরচ কিছুটা কমিয়ে আনা যেতে পারে এবং পাইকারি ও খুচরা বাজারের সব ধরনের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি ইলিশসম্পদ রক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে ব্যানিং সিজনে (মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে) বাংলাদেশের জলসীমার ভেতরে অবৈধভাবে ভারতীয় জেলেরা যাতে মাছ ধরতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।
প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা সামসুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় ও আমিষ সরবরাহে ইলিশের গুরুত্ব অপরিসীম। ইলিশ ধরা লাভজনক হলেও লাভের অসম বণ্টন, পক্ষপাতমূলক, অসাম্য ও শোষণমূলক ব্যবস্থা এবং ইলিশ আহরণে ব্যাপক খরচ এ সমস্যা সমাধানের প্রধান অন্তরায়। তা ছাড়া সমুদ্রগামী একটি ট্রলারে ৮-১০ দিনে ১০-১৫ জন জেলের জন্য জ্বালানি, বরফ, খাদ্য-দ্রব্য ইত্যাদি বাবদ ৩-৫ লাখ টাকা খরচ হয়। জেলেদের দেওয়া তথ্যমতে, একটি ট্রলারে ২০ মণের (৮০০ কেজি) কম মাছ ধরা পড়লে সব খরচ মেটানোর পর আর কোনো লাভই থাকে না, ক্ষেত্রবিশেষে লোকসানও হয়ে থাকে।
বাজারে ইলিশ মাছের দাম নাগালের মধ্যে না থাকার অনেক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইলিশ মাছের দাম বৃদ্ধির কারণ হলো চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা, নদী ও সমুদ্রের ইলিশের মধ্যে স্বাদের পার্থক্য, মোকামে আসার আগেই সাগরে হাতবদল হয়ে যাওয়া, আড়তদার/মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেওয়া ও তাদের কাছেই বাধ্যতামূলকভাবে কম দামে মাছ বিক্রি করা, কুলিভাড়া, ভ্যানভাড়া ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়া, অবৈধ জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে ছোট-বড় ইলিশ আহরণ, দেশীয় ট্রলিং জাহাজগুলোর তীরবর্তী অল্প গভীরতায় মাছ আহরণ, ভরা মৌসুমে আড়তদারদের কোল্ডস্টোরেজে বেশি বেশি মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং পরবর্তী সময়ে সেসব ইলিশ বিভিন্ন বাজারে চড়া দামে বিক্রি বা চোরাচালান করা, বিত্তবানদের নিজেদের খাওয়ার জন্য সারা বছর ফ্রিজে ইলিশ মজুত করে রাখা, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, বরফের মূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি। এ ছাড়াও রয়েছে প্যাকিংয়ের বাক্স, হোগলাসহ অন্যান্য উপকরণ খরচ, ভারতে রপ্তানির ঘোষণা, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে ইলিশের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আহরণ খরচ বৃদ্ধিসহ নানা কারণেও ইলিশের দাম বাড়ছে। ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার থেকে শুরু করে জেলে, মহাজন, আড়তদার, পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী হয়ে ক্রেতা পর্যন্ত ক্ষেত্রভেদে চার থেকে পাঁচ হাত ঘুরে ইলিশ ভোক্তার হাতে পৌঁছায় এবং প্রতি হাতবদলে প্রায় ১০-১৫ শতাংশ করে ইলিশের দাম বৃদ্ধি পায়। ফলে চূড়ান্তভাবে ক্রেতার নিকট পৌঁছাতে একটি ইলিশের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
ইলিশের দাম কমাতে কার্যকরী পদক্ষেপের প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরবরাহ চেইন আধুনিকায়ন করা, মাছ সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পরিবহন নিশ্চিতকরণ, পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। জেলেদের হরেক-রকম খরচ, যেমন- ডিজেলের দাম, জাল, সুতা ও রশির দাম কমাতে ভর্তুকি দেওয়া। ইলিশ মাছের চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। সমন্বিতভাবে বাজার মনিটরিং করলে মূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সেক্ষেত্রে জেলা মৎস্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করতে পারে। তা ছাড়াও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো দাম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বাংলাদেশে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ডের ব্যাপকভাবে সমুদ্রসীমা পাহারা দেওয়ার অপ্রতুলতার কারণে ভারতের জেলেরা ৩৮ দিন বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ ধরে নেওয়ার সুযোগ পায়। কাজেই ভারতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশে একই সময়ে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা জারি হলে এ সমস্যার লাঘব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসন যদি ইলিশ অবতরণ কেন্দ্র ও জেলেদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারে তাহলে ইলিশের বর্তমান খুচরা উচ্চমূল্য থেকে অনেক কম দামে ইলিশ বিক্রি সম্ভব। ইলিশ অবতরণ কেন্দ্র থেকে শুরু করে খুচরা বাজারের ক্রেতা পর্যন্ত জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান একযোগে পরিচালনা করলে সুফল পাওয়া যাবে। ঋণ ব্যবস্থা সহজীকরণ করা উচিত; যাতে জেলে, ট্রেডার এবং আড়তদাররা সরকার এবং এনজিওর কাছ থেকে সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ পেতে পারে। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে সরাসরি জেলেদের কাছ থেকে উন্মুক্ত ডাকে ইলিশ কেনার ব্যবস্থা করা উচিত। এ ছাড়াও জেলেদেরকে কো-অপারেটিভ সোসাইটি তৈরিতে উৎসাহিত করতে পারলে তাদেরকে আর মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিতে হবে না, যা ইলিশের দাম কমাতে সহায়ক হবে। তদুপরি নৌপথে পরিবহন করলে এক ট্রাক সমপরিমাণ ইলিশে পরিবহন খরচ প্রায় ৩০০০ টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব, যদিও এক্ষেত্রে নৌকা ঘাট থেকে আড়ত পর্যন্ত লোড-আনলোড করার জন্য কিছুটা বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ ছাড়াও টেকসই ইলিশ বিপণন ব্যবস্থার জন্য সরকারি পর্যায়ে একটি নীতিমালা থাকা আবশ্যক।
প্রধান গবেষক ইলিশ আহরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচ কমানোর জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি, দাদন প্রথা দূর করতে জেলেদের জন্য বিকল্প আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আরও মনে করেন যে, ইলিশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনা ও নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গবেষণাটিতে আরও কাজ করেছেন, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ইফতেখার আহমেদ ফাগুন। গবেষণা কার্যক্রমটি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্স সিস্টেমের (সাউরেস) অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে।