রাঙামাটির নানিয়ারচর, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ও মানিকছড়িতে ১০টি মোবাইল টাওয়ারের সংযোগ ও বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। ইন্টারনেটসেবাসহ মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। এসব এলাকা পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন প্রসিত খীসার ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নিয়ন্ত্রিত। তবে কারা এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তা বলতে চাননি কেউ। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ২২ জানুয়ারি ভোরে একযোগে এসব মোবাইল টাওয়ারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও এখনো পুনঃসংযোগ দেওয়া হয়নি। তবে স্থানীয়রা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন, পাহাড়ে শান্তি-স্থিতিশীলতা ও যোগাযোগের সুবিধার্থে দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।
ভৌগোলিক অবস্থার কারণে পার্বত্য এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা বেশ দুরূহ। পর্যাপ্ত সড়ক যোগাযোগ গড়ে না ওঠায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এখনো অনেক পিছিয়ে আছে এই এলাকার মানুষ। তবে মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় আসায় আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন তারা।
কিন্তু সেই মোবাইল নেটওয়ার্কও দুর্বৃত্তদের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ৪টি, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ৫টি, মানিকছড়ি উপজেলায় ১টিসহ রবি ও টেলিটকের ১০টি মোবাইল টাওয়ারের সংযোগ ও বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। কয়েকটি টাওয়ার অফিস ভাঙচুর ও সরঞ্জাম নষ্ট করেছে তারা। এর মধ্যে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বেতছড়িতে ২টি, ঘিলাছড়ি ও ছনখোলা পাড়ায় ২টি, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া কার্বারী পাড়া, বাঘাইছড়ি মুখ, জারুলছড়ি, বড়াদম, সাধনাটিলাসহ ৫টি এবং মানিকছড়ি উপজেলায় ১টি টাওয়ারের সংযোগ কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে পুরোপুরি যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছে।
গতকাল রবিবার নানিয়ারচর বেতছড়ি জেনারেল ওসমানী উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, টাওয়ারের সংযোগ বিচ্ছিন্নের চিত্র। পাহাড়ের ওপর ১ জানুয়ারি ১৯৮০ সালে স্থাপিত হয় বিদ্যালয়টি। এর পেছনে উত্তর প্রান্তের রবি ও টেলিটকের দুটি টাওয়ার থেকে সেবা নেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু দুর্বৃত্তরা টাওয়ার দুটির সার্ভারের সংযোগ লাইন ও বিদ্যুৎ সংযোগের বিভিন্ন স্থানে কেটে দিয়েছে। এতে টাওয়ার দুটির কার্যকারিতা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিদ্যালয়টি থেকে চোখের দূরত্বে বেতছড়ি বাজার। সেখানকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. হারুন বলেন, ‘শুনেছি টাওয়ারের লাইন কেটে দিছে। আজকে প্রায় ১৪-১৫ দিন হচ্ছে। এখন আমরা ফোন করতে পারছি না। কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। খবরবার্তাও নিতে পারছি না। পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।’
বেতছড়ি বাজারের রিচার্জ ব্যবসায়ী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘নেটওয়ার্ক ২২ জানুয়ারি থেকে বন্ধ। এখন সমস্যা হচ্ছে আমরা তো রিচার্জ করি, নগদ ও বিকাশ করি। এখন সব বন্ধ। আয়-রোজগারও কমে গেছে।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের দীঘিনালা উপজেলা সভাপতি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান সময় হচ্ছে ডিজিটাল যুগ। এখন মানুষ অনেকটাই নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। সেই নেটওয়ার্ক না থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারছে না। মোবাইল ব্যাংকিংও ব্যাহত হচ্ছে। এ সমস্যা দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি।’
সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ভোগান্তি হলেও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি মোবাইল অপারেটর রবি ও টেলিটকের স্থানীয় কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন পার্বত্য জেলার রবি অপারেটরের নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে কতদিন লাগতে পারে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বসে এটা ঠিক করবেন। সময় লাগবে। আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।’
জেলা পুলিশ সুপারও বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
নানিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নাজির আলম বলেন, ‘টাওয়ারের ঝামেলা এখনো চলছে। টেলিটকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা এগুলোর সমাধানের চেষ্টা করছেন। কেউ ধরা দেন না। যারা কাটেন তাদেরও পাওয়া যায় না। তারা নিজেরাই সমাধান করেন। লিখিত অভিযোগ দিলে বিস্তারিত জানা যায়, কোথায় কী হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’