বাউল সম্রাট লাালন শাহের জন্মভূমি খ্যাত ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার ফলসী ইউনিয়নের শড়াতলা গ্রামে বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধের নোটিশ সাঁটানো হয়েছে। এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে হকার ও তৃতীয় লিঙ্গের হিজড়া নিষিদ্ধের নোটিশও দেওয়া হয়েছে ওই গ্রামে। উপজেলার শড়াতলা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে সাঁটানো এই নোটিশের ছবি ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় শুরু হয়। হুঁশিয়ারি দিয়ে ওই নোটিশে বলা হয়েছে বাদ্যযন্ত্র বাজালে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে গুনতে হবে জরিমানা।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রামবাসীর পক্ষে সকল প্রকার বাদ্যযন্ত্র ও হকার নিষিদ্ধকরণের জন্য এই নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে স্বাক্ষরকারীদের একজন শড়াতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মশিউর রহমান জানান, গ্রামবাসী ডিজে পার্টি এবং উচ্চ শব্দের কারণেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের কথা জানান তিনি। তবে শড়াতলা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে সাঁটানো একশ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের এই নোটিশটি আইনবহির্ভূত বলছেন হরিণাকুন্ডু উপজেলা প্রশাসন।
মরমী সাধক ফকির লালন শাহের জন্মভূমি ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলা। এ উপজেলার হরিশপুর গ্রামে বাউল সাধক লালন শাহ্, পাঞ্জু শাহ ও দুর্দ্দু শাহের পৈতৃক ভিটা রয়েছে। প্রতিবছর সেখানে সাধু-সঙ্গ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। দূরদূরান্ত থেকে আগত বাউল সাধুরা সাধু সঙ্গে অংশ নেন।
গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে লালন আখড়া ও মাজারে হামলা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা বা বন্ধ করে দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
নোটিশের ঘটনায় হরিণাকুন্ডু থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এরপর উপজেলা প্রশাসন শড়াতলা গ্রামে সাঁটানো সেই নোটিশটি অপসারণ করেছেন।
হরিণাকুন্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিএম তারিক উজ জামান জানান, শড়াতলা গ্রামবাসী কোন উদ্দেশে, কেন এই নোটিশ দিয়েছিল সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে গ্রামটিতে এর আগে কখনো হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সম্পর্কে কোনো ঘটনা বা অভিযোগের এমন কোনো তথ্যও তার কাছে নেই বলে জানান তিনি।
হরিণাকুন্ডু উপজেলার শড়াতলা গ্রামের বিভিন্ন স্থানের দেয়ালে বেশ কিছু একশ’ টাকার ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের সাঁটানো নোটিশের শিরোনাম ছিল সকল প্রকার বাদ্যযন্ত্র ও হকার নিষিদ্ধকরণের নোটিশ। গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশে আরও বলা হয়েছে, যারা এই গ্রামে বাদ্যযন্ত্র বাজাবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কেউ এ আদেশ অমান্য করে তাকে নগদে চার হাজার টাকা জরিমানা করা হবে বলে নোটিশে বলা হয়েছে। নোটিশ অমান্যকারীদের বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ওই গ্রামে সব ধরনের হকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে গ্রামে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
গ্রামবাসির দাবি, শড়াতলা গ্রামের ৯৫ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ২০ জনের মত। নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে গ্রামবাসী এই সিদ্ধান্ত নেন বলে নোটিশে জানানো হয়েছে। নোটিশের শেষাংশে ওই গ্রামবাসীর পক্ষে ১৯ জনের হাতে লেখা স্বাক্ষর রয়েছে। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন শড়াতলা গ্রামের পশ্চিমপাড়া মসজিদের সভাপতি, কলেজের শিক্ষক, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, বিএনপির স্থানীয় কমিটির সভাপতি, ইউপি সদস্য ও ব্যবসায়ী।
নোটিশে স্বাক্ষরকারী শড়াতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মশিউর রহমান বিষয়টি নিয়ে খুবই বিপদে আছেন বলে জানান। মশিউর রহমান আরও বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সমস্যার সমাধান করা হবে। তবে শড়াতলা গ্রামে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কেন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, নোটিশ জারির কাজটি সবাই মিলেই করেছে, কিন্তু আমাকে দোষারোপ করা হচ্ছে। শড়াতলা গ্রামে গান-বাজনার কোনো রেওয়াজ নেই। এই গ্রামে আমাদের কোনো শিল্পীও নাই। গ্রামে শুধু উচ্চ শব্দ করা হয়। এখানে হয় ডিজে পার্টি। ডিজে পার্টি আসে, মাঝে-মধ্যেই উচ্চ শব্দ হয়।
হরিণাকুন্ডুর ইউএনও বিএম তারিক উজ জামান বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাদ্যযন্ত্র বন্ধে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, প্রচলিত আইনে প্রশাসনের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। এটা উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নয়। শড়াতলা গ্রামের কতিপয় ব্যক্তি যারা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করেছেন তারা ব্যক্তিগতভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে।
হরিণাকুন্ডু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠিও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। কি কি ব্যবস্থা নিতে হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে ওই চিঠিতে। ইউএনও বলেন, নোটিশ সাঁটানোর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কারো কোন উস্কানি ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। গান–বাজনা বন্ধ করাই এই নোটিশের উদ্দেশ্য ছিল কিনা সেটিও তদন্ত শেষে জানা যাবে বলে জানান প্রশাসনের এই কর্মকর্তা। হরিণাকুন্ডু থানা পুলিশ এবং ঝিনাইদহ ডিবি পুলিশ শড়াতলা গ্রাামে এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। সাম্প্রদায়িক কোনো ইস্যু তৈরির আশঙ্কাসহ সবগুলো বিষয়ই খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মাহফুজুর রহমান/মাহফুজ