এক-দুই বছর নয়, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে হাজারও রোজাদারের ইফতারের ভরসা ফেনীর জহিরিয়া মসজিদ। এখানে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শ্রমজীবী, পথচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এক কাতারে বসে ইফতার করেন। মসজিদ কমিটির মতে, প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মানুষে এখানে ইফতার করেন।
ফেনী শহরের শহিদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কে অবস্থিত জহিরিয়া মসজিদের পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, মসজিদের ৩০ জন খাদেম ও স্বেচ্ছাসেবক প্রতিদিন আসরের নামাজের পর থেকে ইফতার বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেন। মসজিদের তৃতীয় তলায় সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় ইফতার। সাড়ে ৫টা থেকে রোজাদাররা আসতে শুরু করেন। স্বেচ্ছাসেবকরা রোজাদারদের সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে দেন। ইফতারের সময় পর্যন্ত সবাই জিকির ও কোরআন তেলাওয়াতে ব্যস্ত থাকেন। ইফতারের সময় হলে ইফতার করেন।
ইফতার করতে আসা রিকশাচালক আবদুর রহমান বলেন, ‘গত সাত বছর ধরে এখানে ইফতার করি। আগে কোথায় ইফতার করব তা নিয়ে চিন্তা করতে হতো। একদিন শুনলাম জহিরিয়া মসজিদ বিনামূল্যে ইফতার দেওয়া হয়। এরপর থেকে আমি এখানে ইফতার করি।’
একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন মো. মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘আগে ইফতারের সময় হলে দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো কোথায় ইফতার করবো। কিন্তু এখন ইফতার করা নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। প্রতিদিন এ মসজিদে ইফতার করতে আসি। শত শত মানুষের সঙ্গে ইফতার করার অনুভূতিই অন্যরকম।’
ইফতার করতে আসা মোরশেদ আলম বলেন, ‘১ হাজার ২০০ মানুষ একটি মসজিদে ইফতার করেন, এটি ফেনীর ইতিহাসে বিরল। এখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ইফতার করতে পারেন। রমজানে ইফতার নিয়ে কারও দুশ্চিন্তা করতে হয় না।’
স্বেচ্ছাসেবী ও মসজিদের খাদেমরা জানান, ইফতারে বিরিয়ানি, খেজুর, ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, শসা, শরবত, জিলাপি, পায়েশের মতো সুস্বাদু খাবার শৃঙ্খলার সঙ্গে বণ্টন করা হয়।
ইফতার আয়োজক কমিটির সদস্য সাইফুল ইসলাম সোহেল বলেন, ‘প্রতিদিন আসরের নামাজের পর থেকে ইফতারি বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। মসজিদের ভেতরে সারিবদ্ধভাবে ইফতারগুলো দেওয়া হয়। রোজাদাররা এসে সেখানে সারিবদ্ধভাবে বসে ইফতার করেন। রোজাদারদের খেদমত করার ভাগ্যের ব্যাপার। যে কেউ চাইলেই এমন আয়োজনে শরিক হতে পারেন না। আল্লাহপাক আমাদের কবুল করেছেন এ জন্য আমরা খেদমত করছি।’
জহিরিয়া মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য ফারুক হারুন বলেন, ২০০৭ সালে পবিত্র মক্কায় ওমরাহ হজে গিয়ে দেখি লাখ লাখ মানুষ সুশৃঙ্খলভাবে একসঙ্গে ইফতার করছেন। দেশে এসে আমাদের মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করি। গরিব, অসহায়, শ্রমজীবী, পথচারী এমন রোজাদারদের জন্য ইফতারের আয়োজন করলে কেমন হয়। কমিটির সদস্যরা সবাই এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন। এরপর ২০০৮ সাল থেকে মসজিদে বিনামূল্যে উন্নতমানের ইফতার কার্যক্রম শুরু করি। শুরুতে ১৫০ থেকে ২০০ রোজাদার হলেও পর্যায়ক্রমে ৫০০ থেকে ৭০০ রোজাদার এখানে ইফতার করতেন। বর্তমানে ১ হাজার ছাড়িয়েছে।
প্রতিদিন হাজারও মানুষের ইফতারের আয়োজনে অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মসজিদের তহবিল ছাড়াও ইফতারের টাকা জোগাড় হয় মুসল্লিদের দান-অনুদানে। প্রতিদিন এই মসজিদে চার থেকে পাঁচ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। এসব মুসল্লির অনেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে একদিনের অর্থ বহন করেন। কখনো কয়েকজন মুসল্লি মিলে ইফতারের আয়োজন করেন। এভাবে মুসল্লিদের দান-অনুদানের মাধ্যমে ইফতার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’