‘তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না, করে শুধু মিছে কোলাহল’ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৬ সালে কথাটি লিখেছিলেন যেন এর দুই বছর আগে ১৮৮৪ সালে জন্ম নেওয়া মৌলভী আবদুর রহমানকে ভেবে। শতবছর আগে ১৯২৫ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে যিনি প্রত্যন্ত গ্রাম নিজ এলাকায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলায় নিজ নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের নাম দল্টা রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘দল্টা রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ গত ঈদুল ফিতরের পরদিন ১ এপ্রিল এক ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে স্কুলের পাকিস্তান আমলের এক শিক্ষার্থী আত্মসমালোচনা করে বলেন, ‘বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী আবদুর রহমানকে আমরা আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খুব একটা স্মরণ করি না।’ তার এই কথায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওই বাক্যটিই যেন প্রতিধ্বনিত হয়। অবশ্য বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনকে সামনে রেখে আয়োজিত এই পুনর্মিলনীতে গুণীজনদের দেয়া বক্তব্যে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতার মহানুভবতার কথা বারবার উঠে আসে।
সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানার সঞ্চালনায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
১৯২৫ সালের ১ জানুয়ারি স্থাপিত বিদ্যালয়টি শুরু থেকেই দশম শ্রেনী পর্যন্ত ছিল - এমন নয়। ১৯৫৪ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষা দেয় এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রথম ব্যাচের পরীক্ষার্থীদের একজন ‘ডাক্তার’ আব্দুর রহমান। প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর যিনি একধিক মেয়াদে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সভাপতিও ছিলেন। অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে তিনি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অগ্রজ মৌলভী আবদুর রহমানকে আদর্শ মেনে অনুজ বর্তমান প্রজন্মকে সমাজ সেবায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ হারুন আল রশিদ অ্যালামনাইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত গবেষণাধর্মী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগ খরচ আসে অ্যালামনাই থেকে। এখানকার সাবেক শিক্ষার্থীরা তাদের আয়ের একটি অংশ অ্যালামনাইয়ের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার জন্যে দিয়ে থাকেন।
শতবর্ষী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যাবস্থপনা পর্ষদের সভাপতি এবং স্থানীয় সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ দল্টা ডিগ্রি কলেজের ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সভাপতি মো: ওমর ফারুক শাকিল চৌধুরী অ্যালামনাইকে সর্বাত্মক সহযোগীতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে আবদুল মান্নান অ্যালামনাইকে এগিয়ে নিতে যার যার অবস্থান থেকে সাবেক শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রহমত উল্লাহর শিশুপুত্র তাহসিনুল ইসলাম সায়ান’র কণ্ঠে কোরআন তেলওয়াতের মধ্য দিয়ে ওই দিন বিকালে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়ে রাত প্রায় দশটা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
অনুষ্ঠানে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল আলম (মামুন) শতবর্ষী এই বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতাকে স্মরণ করা প্রসঙ্গে বলেন, প্রয়াত মৌলভী আবদুর রহমানকে স্মরণ করতে হবে আমাদের স্বার্থে, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে। অগ্রজ ওই দানবীরকে স্মরণ করলে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সামর্থবানরা লক্ষ্য করবেন যে, সামাজিক কাজে অবদান রাখলে মৃত্যুর শতবছর পরও দেশ - সমাজ তাকে স্মরণ করতে পারে। আর শুধু নিজেকে নিয়ে বাঁচলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কাউকে মনে রাখবে না, এমনকি নিজের উত্তর প্রজন্মও কাউকে মনে রাখবে না।
স্কুল প্রতিষ্ঠার ১১ বছর আগে ১৯১৪ সালে রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্রোতাপ্রিয় আরেক গান 'তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে, এ আগুন ছড়িয়ে গেল সব খানে॥' স্মরণ করে মাহমুদুল আলম (মামুন) বলেন - দল্টা রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের জঠর থেকেই দল্টা কলেজের জন্ম। ব্যপ্তি বেড়ে যা বর্তমানে ডিগ্রি কলেজ হয়েছে। দল্টা কলেজ বা দল্টা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠায় যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের প্রায় সবাই এই দল্টা রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। অর্থ্যাৎ এই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা এরইমধ্যে প্রমাণিত। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গ্রামে - শহরে - প্রবাসে থাকা অনুজ প্রজন্মের সবাইকে নিয়ে বিদ্যালয় তথা এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চায়।
অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের সাবেক অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হুদা পাটওয়ারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক পরীক্ষা উপ-নিয়ন্ত্রক মো. খোরশেদ আলম ভূঁইয়া, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক গোলাম মোস্তফা, কুসুম মজুমদার, স্থানীয় কবি শাহাদাৎ হোসেন (স্বপন), অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রকৌশলী শাহাদাৎ হোসেন, শিক্ষক আবুল বাসার পাল, শিক্ষক শহিদ উল্লাহ, শিক্ষক জসিম উদ্দিন পাল, শিক্ষক ফেরদাউস আহমেদ, শিক্ষক ওমর ফারুক, শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন, শিক্ষক শাহ আলম, ব্যাংকার শাহ আলম মজুমদার, মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া (শুভ্র) ও মাঈনুল ইসলাম (অনু) প্রমূখ।
সিফাত/