মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত দুটি অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাবের মধ্যে একটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। মানিকগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, হৃদরোগের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারা এই মেশিনগুলো চালু করে জেলার চিকিৎসাসেবায় নতুন দ্বার উন্মোচন করার। অথচ বছরের পর বছর প্রশিক্ষিত জনবল না থাকার অজুহাতে ক্যাথল্যাব দুটি চালু করা হয়নি। এখন একটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে জেলাজুড়ে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, এই জেলা কি তবে গুরুত্বহীন? প্রায় ১৬ লাখ মানুষের জন্য হৃদরোগের আধুনিক চিকিৎসাসেবা কি শুধুই স্বপ্ন হয়ে থাকবে? ক্যাথল্যাব স্থানান্তরের আদেশ বাতিল করে দ্রুত সেবা চালুর দাবি স্থানীয়দের।
গত ৮ মে পাঠানো মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সেখানে চিকিৎসাসেবা জোরদারে উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর অংশ হিসেবে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুটি ক্যাথল্যাবের মধ্যে একটি উপযুক্ত ক্যাথল্যাব চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১ শাখার উপসচিব মো. শাহাদত হোসেন কবির এই নির্দেশনা জারি করেন।
মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে ১৯ কোটি টাকা দামের দুটি ক্যাথল্যাব। ২০২০-২১ অর্থবছরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রেড হাউস ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এইচটিএমএস নামের প্রতিষ্ঠান দুটি ক্যাথল্যাব সরবরাহ করে। কিন্তু দক্ষ জনবল সংকটের কারণে এতদিনেও এনজিওগ্রাম ও হার্টের রিং বসানোর এসব মেশিন চালু করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে এই জেলার মানুষদের হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়ে উচ্চ ব্যয়ে সেবা নিতে হচ্ছে। অথচ নিজ জেলার হাসপাতালে সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহারযোগ্য না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক। এর মধ্যে একটি ক্যাথল্যাব স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত মানিকগঞ্জবাসীর প্রতি চরম অবিচার।
মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন খান বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ ভালো চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছোটাছুটি করি। নিজের জেলায় যদি এই ধরনের প্রযুক্তি থাকে, তাহলে তা চালু না করে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত মানা যায় না। এটা আমাদের প্রতি অবিচার।’
নুরুল আমিন নামে একজন বলেন, ‘আমি নিজেও হৃদরোগে ভুগছি। চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে বলেছেন। অথচ আমাদের জেলায় দুই-দুইটা ক্যাথল্যাব ছিল- কিন্তু সেগুলো ব্যবহার হয়নি! এটা কেবল অব্যবস্থাপনা নয়, এটা চরম ব্যর্থতা। এখন আবার একটাকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর মানে হলো মানিকগঞ্জের মানুষের জীবনের মূল্য নেই? এটা অত্যন্ত লজ্জার বিষয়।’
আনোয়ার চৌধুরী নামে পৌর শহরের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘সরকার এত টাকা খরচ করে এই প্রযুক্তি দিয়েছে। পরে সেগুলো ব্যবহারের ব্যবস্থা না করে বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়। এখন অন্যত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত এসেছে। এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের জেলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। দুটি ক্যাথল্যাবই মানিকগঞ্জে থাকা জরুরি। কারণ জেলার জনসংখ্যা ও রোগীর চাপ দিন দিন বাড়ছে।’
জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সদস্য অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এমন সিদ্ধান্ত আসা এই জেলার জন্য এক ধরনের বিপর্যয়। যখন রোগীদের জীবন রক্ষাকারী একটি প্রযুক্তি বছরের পর বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকে, আর শেষে তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়- তখন প্রশ্ন ওঠে ব্যবস্থাপনার দায়ভার কার? যারা এতদিন ক্যাথল্যাব দুটি চালু করতে পারেননি, তারাই এ সমস্যার জন্য দায়ী।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, ‘মানিকগঞ্জ জেলা ঢাকার পার্শ্ববর্তী হলেও স্বাস্থ্যসেবার মান খুবই নাজুক। তারপরও মেডিকেল কলেজের কল্যাণে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তাতে জেলার মানুষ আশাবাদী হয়েছিল। কিন্তু এই হাসপাতালের ক্যাথল্যাব অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি মনে করি, এটা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার ফল।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাই মানিকগঞ্জবাসীর স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সেটাকে বিবেচনা করে ক্যাথল্যাব এখানেই রেখে দ্রুত চালুর ব্যবস্থা করা হোক।’
মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে থাকা দুটি ক্যাথল্যাব থেকে একটি ক্যাথল্যাব চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুটি ক্যাথল্যাব স্থাপনের পর প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে তা চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে আমি যোগদানের পর থেকেই এটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই একটি ক্যাথল্যাব চালু হবে।’