ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণার পর থেকেই নেতা-কর্মীদের ভেতর চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়, বন্ধু কোটা এবং বিতর্কিতদের কমিটিতে পদায়ন করা হয়েছে। পক্ষান্তরে রাজপথে পরীক্ষিত-ত্যাগী, মামলায় জর্জরিত এবং পরীক্ষিত অনেক নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা বিএনপির অন্তত ৫ জন নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, গত ৯ মে জেলা বিএনপির কমিটি গঠিত হওয়ার পর থেকেই জেলাজুড়েই সমালোচনার ঝড় বইছে। কমিটিতে কয়েকজন বির্তকিত ব্যক্তি জায়গা পেয়েছেন। বিএনপির নির্দেশ অমান্য করে সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সশরীরে প্রচার চালিয়েও কমিটিতে পদ পেয়েছেন। ২০১৮ সালের পর থেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তারা কেউই সক্রিয় ছিলেন না।
যেসব বিতর্কিত নেতাকে পদায়ন করা হয়েছে, তাদের একজন জেলা বিএনপির সদ্য ঘোষিত কমিটির অর্থনীতিবিষয়ক সম্পাদক কাজী নাজমুল হোসেন তাপস। তিনি ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর বকশীবাজারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও যুবলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য আলাআমীনের বিয়েতে হেলিকপ্টারে করে আওয়ামী লীগদলীয় এমপি বাদলের সঙ্গে যান। এ ছাড়া গত বছরের ৫ আগস্টের পর হঠাৎ আবির্ভূত হয়েই বাগিয়ে নেন পদ-পদবি।
নেতারা জানান, সেই সময়ে আওয়ামী লীগদলীয় এমপি ফয়জুর রহমান বাদল ও তার ভাই মুনতাসির রহমান অপুর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন নাজমুল হোসেন তাপস। বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে। এমন একাধিক ছবি খবরের কাগজের হাতেও রয়েছে।
জানা যায়, তাপস ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে (নবীনগর) বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু ওই নির্বাচনের পর থেকে তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পরে নবীনগর উপজেলায় তাপসের যাতায়াত বেড়ে যায় এবং আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবেও ঘোষণা দেন।
এ ছাড়া উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ফারুক আহমেদ, নবীনগর পৌর ছাত্রদল থেকে পদত্যাগকারী আশরাফ হোসেন রুবেল, উপজেলা বিএনপির পদত্যাগী মাইন উদ্দিন মাইনু ও শোকজপ্রাপ্ত মফিজুর রহমান মুকুলকে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করেন তাপস।
এ বিষয়ে নাজমুল হোসেন তাপস খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিগত সময়ে ৬০০ নেতা-কর্মীর নামে থাকা মামলা দেখভাল তিনিই করেন। বিশেষ করে ২০১৮ সালের পরই রাজনীতির সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর পরই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। হেলিকপ্টারে যাতায়াতের বিষয়ে আগেই বিএনপির হাইকমান্ডকে জানিয়েছি। তবে আলাআমীনকে আমি চিনতাম না, তার বাবা মলয় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন।’
সদ্য ঘোষিত কমিটির সহসভাপতি হয়েছেন অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান মঞ্জু। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগদলীয় এমপি এবাদুল করীম বুলবুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তৎকালীন ছাত্রদল থেকে পদত্যাগকারীদের বিরুদ্ধে নালিশ করেন মঞ্জু।
আবু ছায়েদ কমিশনার নতুন কমিটির সদস্য হয়েছেন। তার সদস্য নং-৯০। নবীনগর পৌর বিএনপির সাবেক এই সভাপতি ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে নবীনগর থানায় ‘তিনি আর রাজনীতি করবেন না’- এই মর্মে মুচলেকা দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এমপি ফয়জুর রহমান বাদলের কাস্টিং ভোট বেশি দেখানোর জন্য কাজ করেছেন এবং বাদলের ভাই অপুর সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় খুব দাপটের সঙ্গে এলাকায় চলাফেরা করেছেন। বিগত সময়ে এমপি বাদলকে বিভিন্ন সামাজিক প্রোগ্রামে প্রধান অতিথি করে নিজে সভাপতিত্ব করেছেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নবীনগর উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদের পক্ষ নির্বাচনি প্রচার চালান। এ জন্য আবু ছায়েদকে জেলা বিএনপি শোকজ করে।
জেলা বিএনপির সদ্য ঘোষিত কমিটির সদস্য হয়েছেন হযরত আলী (সদস্য নং-১২১)। ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি থেকে নবীনগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজি সাহাব উদ্দিনকে দলীয় মনোনয়ন দেন। তখন সাহাব উদ্দিনের পক্ষে কাজ করবেন না বলে ঘোষণা দিয়ে নবীনগর উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন হযরত আলী। এ ছাড়া ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী এমপির কাস্টিং ভোট বেশি দেখানোর জন্য কাজ করেছেন এবং সর্বশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সরাসরি বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন।
নতুন কমিটির ৯১ নম্বর সদস্য নবীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম। ২০১৮ সালের পর থেকে তিনি দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেননি। তার আগে ২০১৭ সালে নবীনগর উপজেলা মিলনায়তনে একাদশ সংসদ নির্বাচনে এমপি বাদলকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করার আহ্বান জানান শফিকুল ইসলাম। তখন বিষয়টি ফেসবুকে ভাইরাল হয়।
নতুন কমিটির ২৯ নম্বর উপদেষ্টা করা হয়েছে মো. ফারুক মিয়াকে। তিনি ২০১৮ সালে দলে যোগ দিয়ে বাগিয়ে নেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যপদ। তার পরে আর কোনো পদে আসতে পারেননি। এরই মধ্যে ২০২৪ সালে সংসদ নির্বাচনে নবীনগর উপজেলা থেকে এমপি প্রার্থী এবং একই সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মাওলানা মেহেদি হাসানের নির্বাচনে অর্থনৈতিক বিষয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।
নতুন কমিটির আইনবিষয়ক সহ-সম্পাদক হয়েছেন ব্যারিস্টার আশ্রাফ রহমান। ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের এমপি এবাদুল করিম বুলবুলের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করেন এবং একটি সামাজিক সংগঠনের নেতাদের নিয়ে অফিসে শুভেচ্ছা জানাতে যান।
এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিহিংসা বা ক্ষোভের কারণে অনেকে জেলা কমিটির বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন। বিগত সময়ে আবেগের বশে হয়তো কয়েজন ভুল করেছিলেন, তবে পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে মৌখিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে অনেকে হাইকমান্ডের কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমাও চেয়েছেন।