মানিকগঞ্জ শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে একটি খাল। এক সময় এটি ছিল ময়লা-আবর্জনায় ভরা। পরে খালটিকে আধুনিকায়নের স্বপ্ন দেখিয়েছিল মানিকগঞ্জ পৌরসভা। দ্বিতীয় দফার সেই স্বপ্নের প্রকল্পের সূচনা হয় ২০২২ সালে; ঘোষিত মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন। কিন্তু প্রকল্পপঞ্জির ক্যালেন্ডার পেছালেও বাস্তব দৃশ্যপট আজও আগের মতো। এখনো সম্পূর্ণ হয়নি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাজ। বরং বেড়েছে বাজেট। সেই সঙ্গে বেড়েছে জনভোগান্তি আর ক্ষোভ। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এমন মানহীন উপকরণে খালের সৌন্দর্য টিকবে কতদিন?
জানা গেছে, ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো এই খালকে ঘিরে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়। এডিবি ও জিওবির অর্থায়নে তখন প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। সে সময় খালটির দুই পাড় সিসি ব্লক দিয়ে বাঁধানো হয়। এ ছাড়া খালের একপাড়ে চার ফুট চওড়া ওয়াকয়ে এবং পথচারীদের বসার জন্য বেঞ্চও নির্মাণ করা হয়। কিন্তু অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের কারণে তখন পৌরবাসী সুফল পায়নি।
এর পর আবারও ২০২২ সালে সিআরডিপি-২ প্রকল্পের আওতায় শুরু হয় খালের নতুন রূপায়ণের উদ্যোগ। প্রকল্পের আওতায় পুনঃখনন, সৌন্দর্যবর্ধন, তিনটি ব্রিজ ও একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের জন্য ২৫ কোটি ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করে অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স (জেভি)।
কিন্তু প্রকল্পে নির্মিত তিনটি ব্রিজ ও একটি পাবলিক টয়লেটের কাজ শেষ হলেও, খালের দুই পাশে ব্লক দিয়ে স্লোপ নির্মাণের কাজ এখনো চলমান। বসানো ব্লকও অনেক জায়গায় ফেটে যাচ্ছে, কোথাও ভেঙে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু রায়হান বলেন, ‘ব্লকগুলোর মান দেখে মনে হচ্ছে, এগুলো দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এখনই অনেক ব্লকে ফাটল দেখা দিয়েছে। যে মানের উপকরণ ব্যবহারের কথা ছিল, ঠিকাদার টাকা বাঁচাতে সেগুলো ব্যবহার করেননি। সামান্য কয়েক দিন ভারী বৃষ্টি হলেই এসব ব্লক ধসে পড়তে পারে। ফলে এই কাজের স্থায়িত্ব নিয়ে আমার গভীর শঙ্কা রয়েছে।’
প্রকল্পে থাকা ইউনিব্লক দিয়ে নির্মিত দুটি সড়কের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জেলা জজ আদালতের সামনে থেকে মডেল স্কুল এবং দেবেন্দ্র কলেজ থেকে বাজার ব্রিজ পর্যন্ত ইউনিব্লকে নির্মিত সড়কের বিভিন্ন জায়গা ইতোমধ্যে দেবে গিয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া রাস্তার সঙ্গে থাকা আরসিসি ড্রেন ও ম্যানহোলের ঢাকনা উঁচু হওয়ায় চলাচলে সমস্যা হচ্ছে— এমন অভিযোগ মোটরসাইকেল চালক হাফিজুর রহমানের। তিনি বলেন, ‘রাস্তাগুলো এমনিতেই সংকুচিত, তার ওপর উঁচু ড্রেনের ঢাকনার কারণে চলতে আরও সমস্যা হয়। রাস্তায় কাজ ভালো হয়নি, তদারকিও ছিল না।’
স্থানীয় পরিবেশবাদী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এর আগেও তৎকালীন মেয়র গাজী কামরুল হুদা সেলিম খালের দুই প্রান্তে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। এতে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে, শেষমেশ বাধ্য হয়ে বাঁধ ভেঙে দিতে হয়। এখন আবার ঠিকাদার একই কাজ করছে। পানির গতি বন্ধ হলে খাল আর খাল থাকবে না, নালায় পরিণত হবে।’
গত বছরের জুনে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার কয়েকবার সময় বাড়িয়ে তা চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিয়েছেন। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বাজেটও তিন কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কাজের গতি দেখে সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ। বিশেষ করে খালের দক্ষিণ পাশের সড়ক নির্মাণের কাজ এখনো শুরুই হয়নি।
স্থানীয় রুমেদুর রউফ খান রুমেল বলেন, ‘এই প্রকল্পে শুরু থেকেই নানা অনিয়ম ও গড়িমসি চলছে। ঠিকাদারের কাজের মান যেমন নিম্ন, তেমনি তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরাও চোখ বুজে ছিলেন। কারণ সবাই জানে, ঠিকাদার ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। যার কারণে কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। তিন বছরেও কাজ শেষ না হওয়ায় স্পষ্ট যে, এটা উন্নয়ন নয়, বরং দুর্নীতি আর অবহেলার প্রতিচ্ছবি।’ সার্বিক বিষয়ে জানতে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক সানজিদা জেসমীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রকল্প নিয়ে বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ আমি পেয়েছি এবং বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যে আমি প্রকল্প এলাকা কয়েকবার সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। যেসব জায়গায় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো বাতিলের নির্দেশ দিয়েছি। খালের পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত করে যে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল, দ্রুত ভেঙে ফেলার নির্দেশনাও দিয়েছি।’