মো. চুন্নু মিয়া। থাকেন বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার যমুনা নদীর চরের সুজালেরপাড়া গুচ্ছগ্রামে। অন্যের সাহায্য-সহযোগিতায় জীবন চলে তার। পূর্বতেকানি থেকে সুজালেরপাড়া গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণে তিনিও চাঁদা দিয়েছেন। তার মতো আরও বেশ কয়েকজন নিঃস্ব মানুষের নামও চাঁদাদাতাদের তালিকায় রয়েছে।
পূর্বতেকানি চুকাইনগর ভূমিরক্ষা ও পর্যটন বাঁধ নির্মাণ কমিটির আহ্বায়ক এন্তেজার রহমান ব্যাপারী জানান, খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই বাঁধটি নির্মাণে এলাকাবাসী ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছেন। এ ছাড়া বিনামূল্যে দিয়েছেন কোটি টাকা মূল্যের ২৫ বিঘা জমি। গ্রামবাসীর দেওয়া টাকা, জমি আর স্বেচ্ছাশ্রমে প্রায় ৪০ ফুট প্রশস্ত ও ৫ হাজার ৫০০ ফুট দীর্ঘ বাঁধটির কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাঁধটি সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলার ৪০টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সড়কপথে চলাচল সহজ করেছে। পাশাপাশি শত শত বিঘা ফসলি জমি ও বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছে।’
সরকারি রেকর্ড অনযায়ী, ১৯৪০ সালে পূর্বতেকানি চুকাইনগরে একটি রাস্তা ছিল। ১৯৮৪ সালের বন্যায় ওই রাস্তাটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলার অন্তত ৪০টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বিপাকে পড়েন। ৪০ বছর ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরেও এ সমস্যার সমাধান পাননি এলাকার মানুষ। অবশেষে গত ডিসেম্বরে চাঁদার টাকা ও স্বেচ্ছাশ্রমে শুরু হয় পূর্বতেকানি থেকে সুজালেরপাড়া গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণকাজ। বাঁধ নির্মাণের উদ্যোক্তারা দাবি করেন, কাজ শেষ হওয়ার আগেই এ বাঁধের সুফল পেতে শুরু করেছেন হাজার হাজার মানুষ।
সুজালেরপাড়ার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, আগে কষ্টের ফসল হাট-বাজারে নিতে খাল পারাপারে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু সেই নৌকাও পাওয়া যেতে না সময় মতো। ফলে সময় নষ্ট হতো অনেক। খরচও হতো বেশি। তিনি বলেন, ‘রাত ৮টার পর ওই খালে আর কোনো নৌকা চলত না। কেউ নির্দিষ্ট সময়ের পর এলে সারা রাত ঘাটে বসে থাকতে হতো। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হতো রোগী নিয়ে।’
বাঁধটি নির্মাণের অন্যতম উদ্যোক্তা মো. ছানাউল হক জানান, ইতোমধ্যে বাঁধের সুফল পেতে শুরু করেছেন এলাকার মানুষ। কষ্ট হলেও নতুন বাঁধের ওপর দিয়ে হালকা যানবাহনসহ চলাচল করতে পারছেন তারা। তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে ওই খালের তীর ভাঙনে বাড়িঘর হারিয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। আবাদি জমি নষ্ট হয়েছে অন্তত ১০০ বিঘা।’
স্থানীয়রা জানান, রাস্তা বা বাঁধ না থাকায় সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার অন্তত ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বর্ষায় স্কুলে যেতে পারত না। বাঁধটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হলে এলাকার শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া সহজ হবে। এ ছাড়া আগে সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলার পূর্বতেকানি চুকাইনগর, চুরচুকুইনগর ও চালুয়াবাড়িসহ ৪০ গ্রামের রোগীদের হাসাপাতালে নেওয়া ছিল খুবই কষ্টকর। কিন্তু এখন সেই কষ্ট অনেকটা দূর হয়েছে।
বাঁধের কাজ পুরোপুরি শেষ করতে আরও টাকার প্রয়োজন। সেই টাকা কীভাবে জোগাড় হবে এ প্রশ্নের জবাবে এন্তেজার রহমান ব্যাপারী বলেন, ‘এলাকার মানুষ এখনো সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে রেখেছেন। প্রয়োজনে তারা আরও সহযোগিতা করবেন এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’
বহু বছর ধরে এলাকার মানুষের পাশে আছে মনি পঞ্চায়েত কল্যাণ ট্রাস্ট। সামাজিক এ প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের টাকা দিয়েছে বাঁধ নির্মাণে। প্রয়োজনে আরও সহযোগিতার কথা জানান সংগঠনটির চেয়ারম্যান মহিদুল ইসলাম রিপন।
বাঁধের ৮০ শতাংশ কাজে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। অসম্পন্ন কাজের জন্য আরও টাকা লাগবে। এ বিষয়ে মহিদুল ইসলাম রিপন বলেন, ‘সংগঠনটি আরও টাকা দেবে। একই সঙ্গে যার যার ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সহযোগিতা নেওয়া হবে।