কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলায় আক্রান্তের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীই দাউদকান্দি উপজেলার। ক্রমেই আক্রান্তের হার বাড়তে থাকায় ইতোমধ্যে দাউদকান্দি পৌর সভাকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে ঘোষণা করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্তের তথ্য আসছে। যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা গেছে- অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য খবরের কাগজের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পৌর কর্তৃপক্ষের উদাসিনতার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যদিও জেলা প্রশাসনের দাবি, রাজধানীর নিকটবর্তী এলাকা হওয়ায় এ উপজেলায় নগরায়ন দ্রুত সময়ে মধ্যে হচ্ছে। কিন্তু পৌরবাসীর অসচেতনতার কারণে ড্রেনেজ সিস্টেমগুলো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া আছে।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের একজন দাউদকান্দি পৌরসভার দোনারচর এলাকার গৃহবধূ চম্পা বেগম। গত ছয় দিন ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। তার পাশে বসে আছেন ছেলে রাজু আহমেদ। শারীরিক দুর্বলতার কারণে কথা বলতে পারছেন না চম্পা বেগম। রাজু বলেন, ‘আমার বাসায় দুই বোনের ডেঙ্গু। আমার ফুফুরও ডেঙ্গু হয়েছে। মায়ের শরীরের অবস্থা বেশি খারাপ হওয়ায় হাসপাতাল নিয়ে আসি। এনে শুনি, মায়ের রক্তে প্লেটলেট কাউন্ট ৩৫ হাজারে নেমে এসেছে। বাড়ির সবার এমন অবস্থায় আমি চোখে মুখে অন্ধকার দেখছি।’
শুধু রাজু নন, দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি থাকা ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী এবং তাদের স্বজনদের সবার অবস্থা প্রায় একই। তারা জানিয়েছেন, প্রত্যেকের বাড়িতে অন্তত দুই থেকে তিনজন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের প্রতি ঘরে ঘরেই ডেঙ্গু রোগী। যাদের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়, তারাই শুধু হাসপাতালে আসছেন। এর মধ্যে একাধিক মৃত্যুর খবর এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, দাউদকান্দিতে যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের ৯০ শতাংশই শুধু পৌর সভার ৫ এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধিসহ একাধিক কারণে সেসব এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গেল ১৮ জুন পর্যন্ত এ উপজেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ছিল ৭০০ জন। আর ১৯ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত পাঁচ দিনে ১১০০ ব্যক্তির শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, পৌর এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে। ঈদের ছুটিতেই পৌর প্রশাসনের উদাসীনতায় নীরবে ডেঙ্গু বিস্তার লাভ করেছে। অপরিষ্কার ড্রেন ও নালায় এডিস মশা দ্রুত জন্ম নেয়।
সরেজমিনে দাউদকান্দি পৌর সভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ডেঙ্গু সংক্রমণের ‘রেডজোন’ দোনারচর এলাকায় গিয়ে অন্তত দশটি বাড়িতে গিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি বাড়ির একাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। এখানকার বাড়িগুলো খুবই কাছাকাছি। এগুলোর মাঝে যেসব জায়গা রয়েছে সেখানে জমেছে ময়লা আবর্জনা, বৃষ্টির পানি। দীর্ঘদিন সেসব আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়নি। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি খালি জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে সেখানেও এডিস মশার লার্ভা ভাসছে।
এলাকাবাসী জানান, একদিকে ঘনবসতি অন্যদিকে বৃষ্টির পানি জমে থাকার মতো অনুকূল পরিবেশ থাকায় সেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়িয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি বাড়ির মধ্যবর্তী দূরত্ব খুবই কম। এতে মশার মাধ্যমে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ৫ নম্বর ওয়ার্ড ছাড়াও ৪ এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডেও সংক্রমণের মাত্রা খুবই বেশি।
দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবীবুর রহমান বলেন, ‘দাউদকান্দিতে শনাক্তের পরিমাণ অনেক বেশি। জুনের ১ তারিখ থেকে এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। তবে বেশির ভাগই বেসরকারি হাসপাতালে। যার তথ্যগুলো আমরা প্রথমদিকে পাইনি। পরে অনুসন্ধান করে তথ্যগুলো সংগ্রহ করেছি।’
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়ছার বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করছি। আমরা যত্রতত্র ময়লা ফেলছি, ড্রেনেজ সিস্টেমগুলো বন্ধ করে ফেলছি। দাউদকান্দির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি ঢাকার খুব কাছাকাছি হওয়ায় নগরায়ন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে হারে নগরায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে সেই হারে আমরা পয়োনিষ্কাশন সুবিধা বাড়াতে পারিনি। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা যেটুকু রয়েছে সেটিও আমরা নাগরিকরা ময়লা আবর্জনা ফেলে নষ্ট করে ফেলছি।’