চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের থানা কমিটির বিভিন্ন পদ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা বাগিয়ে নিচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে ত্যাগীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। কোথাও কোথাও কমিটি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে। গত ২৬ জুন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের ১৫টি থানা এবং ১২টি ওয়ার্ডের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় সমালোচনা।
উজ্জ্বল মীর নামে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি পোস্টে কমেন্ট করেছেন। সেখানে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন, সুবিধাভোগীদের শাসন! যারা রক্ত ও ঘাম দিয়ে এই সংগঠন গড়েছে, তাদেরকে আজ চিরতরে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা শুধুই সুবিধাভোগী, স্বার্থান্বেষী এবং পৃষ্ঠপোষকদের জায়গা পাওয়ার জন্য?’
বঞ্চিত নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, ৩১ সদস্যবিশিষ্ট চকবাজার থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটিতে অন্তত দুইজন আওয়ামী লীগের লোক জায়গা পেয়েছেন। এর মধ্যে একজন লুটপাট করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন জেলও খেটেছেন। সম্প্রতি জেল থেকে বের হয়ে তিনি চকবাজার থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটিতে পদ পেয়েছেন। তার নাম মাহবুব রহমান। একই কমিটিতে মো. সেকান্দর নামে আরও এক আওয়ামী লীগ নেতা স্থান পেয়েছেন। যদিও আওয়ামী লীগে তাদের পদ-পদবির বিষয়ে বিস্তারিত জানা না গেলেও দলটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের সরব উপস্থিতির একাধিক ছবি খবরের কাগজের হাতে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাহবুব এবং সেকান্দর চকবাজার ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নুর মোস্তফা টিনুর অনুসারী। গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর চকবাজারে দলবল নিয়ে একটি দোকানে হামলা চালাতে গিয়ে মাহাবুব গ্রেপ্তার হন। ওই ঘটনায় পুলিশ তাকে আদালতে পাঠানোর সময় যে প্রতিবেদন দেয় তাতে তাকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করে জামিন না দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মাহবুব এবং সেকান্দরের মোবাইলে কল করা হলেও তারা রিসিভ করেননি।
চট্টগ্রাম শহরের ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক করা হয়েছে শহীদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে। তাকে এই পদ দিয়ে কমিটি ঘোষণার পরপর বঞ্চিতরা এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। বঞ্চিতদের অভিযোগ, ছাত্রলীগ নেতা শহীদুলকে বানানো হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি ওয়ার্ডের আহ্বায়ক। সাধারণ নেতা-কর্মীরা এটা কীভাবে মেনে নেবে।
আকবর শাহ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নাছির আহমেদ বলেছেন, ‘শহীদুল ইসলাম স্বৈরাচারের একজন দোসর। যারা সারা বছর মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন তাদেরকে পদ না দিয়ে ভুল মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া দুঃখজনক।’ এ ছাড়া ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক রেহান উদ্দীনও দলীয় কর্মসূচিতে শহীদুলকে কখনো দেখেননি বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে শহীদুল ইসলামের দাবি, তিনি মহানগরে রাজনীতি করতেন বলে এলাকায় তাকে কেউ চেনে না। সামাজিক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে থাকা কিছু ছবি নিয়ে কেউ কেউ বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
১৪নং লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা নিউ মার্কেট এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলাকারী জাহাঙ্গীরের ভাই রিপনকে চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। তার আরেক ভাই শিপনকে করা হয়েছে লালখান বাজার ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য। ওই ওয়ার্ডের বিএনপির সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান সুমন ১৭ বছর ছিলেন এলাকার বাইরে। তবে মতিঝর্ণা এলাকায় তিনি কিছু বসতঘর ভাড়া দিয়েছেন। এলাকায় না থেকেও গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। লালখান বাজার ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে ছাত্রলীগের রনিকে। সাবেক কাউন্সিলর আ ফ ম আহমদ কবির মানিকের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন রনি। এ সংক্রান্ত একাধিক ছবি খবরের কাগজের হাতে রয়েছে।
লালখান বাজার ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক দাদন সুরুজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘যারা কমিটিগুলো দিচ্ছে তারা কার সুপারিশের ভিত্তিতে দিচ্ছে আমরা বুঝতে পারছি না। দলের জন্য অনেকের ত্যাগ আছে। নির্যাতনের শিকার হওয়া নেতা-কর্মীর সংখ্যা অনেক। আমরা জানি সব ত্যাগীকে মূল্যায়ন করা যায় না। কিন্তু দলের বিপরীত মেরুতে অবস্থানকারী লোককে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দেয়া কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’ তারা জেনেশুনেই বিষপান করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বায়েজিদ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নাজিম উদ্দিন হিরু বলেন, ‘আমি নিজেই যেখানে ত্যাগের মূল্যায়ন পাইনি, সেখানে বাকিদের কথা কি বলব। কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল না এমন ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। যা দলের জন্য কখনোই ভালো হতে পারে না।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বেলায়েত হোসেন বুলু খবরের কাগজকে বলেন, কমিটির নামগুলো থানা এবং ওয়ার্ড থেকেই এসেছে। তবুও আমরা চেষ্টা করেছি কমিটিতে যেন ত্যাগী এবং নির্যাতিতরা স্থান পায়। এর মধ্যেও যদি আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের কেউ স্থান পেয়ে যায়, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।