আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগে। বাবা আবু রায়হান। হতদরিদ্র রিকশাচালক। থাকতেন একটি টিনের ঘরে। কিছুদিন আগেই রিকশা চালিয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। অভাবের সংসার। টেনেটুনে কোনোমতে সংসার চলে। রিয়াদও খুব কষ্ট করে পড়ালেখা করেছেন।
কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর থেকেই রিয়াদদের সংসারে বইছে উল্টো স্রোত। এখন রিয়াদের বাবা আবু রায়হান আর রিকশা চালান না। টিনের ঘরের স্থলে গড়ে উঠছে অট্টালিকা। আড়াই মাস আগে এর নির্মাণকাজ করা শুরু হয়। এর একতলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। ভবনটিতে চারটি কক্ষ রয়েছে। রিয়াদ এখন চলেন দামি বাইকে। এ যেন সত্যিই আলাদিনের চেরাগ!
সেই রিয়াদ গত শনিবার রাতে গুলশানে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। এখন তিনি শ্রীঘরে। আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন তিনিসহ চার চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে।
রিয়াদের গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, অভাবের মধ্যে বড় হওয়া রিয়াদের হঠাৎ পাকা ভবন নির্মাণ নিয়ে এলাকায় নানা ধরনের কথাবার্তা চলছে। গত ৫ আগস্টের পর সমন্বয়ক হয়েছেন। এখন কিছুদিন পরপর বাড়িতে আসেন। তার পোশাকেও পরিবর্তন এসেছে।
তবে রিয়াদের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, রিয়াদ চাঁদাবাজি করেন না। জমানো টাকা, অনুদান ও ঋণ নিয়ে ভবনটি করা হচ্ছে।
রিয়াদের এক সহপাঠী বলেন, রিয়াদ মেধাবী হওয়ায় স্থানীয় বিত্তশালীরা তাকে পড়াশোনায় আর্থিক সহযোগিতা করতেন। তিন মাস আগে তিনি বাড়িতে অট্টালিকা নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তার বাবা ও ভাই আগে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। মজিব কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন রিয়াদ।
সেনবাগ থানার ওসি মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ৫ আগস্টের পর রিয়াদ এলাকায় এসেছিলেন বলে শুনেছি। তিনি এলাকায় লিফলেট বিতরণ করেছেন। উচ্চপদস্থ বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে তার ছবি রয়েছে।
খবরে জানা গেছে, রিয়াদ বর্তমানে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। গত শনিবার রাতে গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসা থেকে রিয়াদসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গুলশান থানায় করা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিয়াদসহ চারজনকে গতকাল সাত দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। ঘটনার পর রিয়াদকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের কথা জানিয়েছে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রিয়াদের এক চাচি বলেন, ‘রিয়াদের বাবা ও বড় ভাই দুজনই রিকশা চালাত। এখন চালায় না। রিয়াদ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে বলে শুনেছেন। গত ৫ আগস্টের পর সমন্বয়ক হয়েছে। কিছুদিন পরপর বাড়িতে আসে। দুই-আড়াই মাস আগে পুরোনো ঘর ভেঙে পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে। তারা এখন পাশের একটি পাকা বাড়িতে ভাড়া থাকে।’
বাবা আবু রায়হান সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সটকে পড়েন। রিয়াদের মা রেজিয়া বেগম বলেন, ‘তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ছোট ছেলে রিয়াদ ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বড় ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে।’
তবে বড় ছেলে ফুটপাতে ব্যবসা করে- এমন কথাও বলেন রিজিয়া বেগম। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বলে জানান।
রেজিয়া বেগম জানান, মানুষের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে, তার স্বামীর আয়ের টাকায় ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন। ছেলে নিজেও টিউশনি করেন, পড়ালেখার খরচ জোগাড় করেন। পাকা ভবন নির্মাণ করছেন বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে, স্বামীর জমানো টাকা দিয়ে। ধারদেনাও করেছেন।
তিনি দাবি করেন, গত বছরের বন্যায় ঘর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বন্যার পর সরকারের কাছ থেকে চার বান্ডিল ঢেউটিন পেয়েছেন। সেগুলো বিক্রি করেছেন। আল-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন। এসব টাকাও ঘরের কাজে ব্যয় করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা জোবায়ের হোসেন জানান, তার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। তার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন রিয়াদ ঢাকার প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তবে কোন বিভাগে পড়েন, তা তিনি জানেন না। আরেকজন বাসিন্দার দাবি, রিয়াদ নাকি কোটি টাকার মালিক। বাড়িতে পাকা ভবন করছেন। দামি বাইক কিনেছেন। আরও নানা কথা শোনা যায়।
আরেকজন বাসিন্দা বলেন, ‘একজন ছাত্র কী করে এত টাকার মালিক হয়? ভেবে কূল পাই না! এখন আবার চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রেপ্তার হলো। আমরা এসবের নিন্দা জানাই।’