ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় বিপর্যস্ত পর্যটন শহর কক্সবাজার। জেলার টেকনাফ অংশে ফের ভাঙতে শুরু করেছে মেরিন ড্রাইভ সড়ক। এ ছাড়া শহরের শৈবাল পয়েন্ট, কবিতা চত্বর পয়েন্টে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে সাবরাং জিরো পয়েন্ট, শাহপরীর দ্বীপ ও মহেশখালীয়াপাড়া নৌ-ঘাট এলাকায় সড়কটির একাধিক অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন পর্যটকরা।
এদিকে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ভাঙন ক্রমেই বড় হচ্ছে। অস্বাভাবিক জোয়ারে তিনটি জায়গায় ধসে গেছে গুরুত্বপূর্ণ এ উপকূলীয় সড়ক। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর জিও ব্যাগ বসানো হলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে সেনাবাহিনী মেরিন ড্রাইভে সংস্কারকাজ শুরু করছে। সেই সঙ্গে ভাঙন ঠেকাতে সি-ওয়াল নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তবে সৈকতের ভাঙন ঠেকাতে এখনো মাঠে নামেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টিতে সাগরে অস্বাভাবিক জোয়ার দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে সাগরে জেলে নৌকা নামানোর কসরত চলে। স্থানীয়রা জানান, গত দুই বছরে এমন ঘটনায় প্রতি বর্ষায় ভেঙেছে মেরিন ড্রাইভ সড়ক। গত দুই দিনে ধসে গেছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের অন্তত ছয়টি জায়গা। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ বসানো হলেও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে কোনো উদ্যোগ নেই। বসতি হারানোর শঙ্কায় প্রায় দুই হাজার পরিবার।
স্থানীয় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক নবী হোসেন বলেন, ‘জলোচ্ছ্বাসের কারণে রাস্তা ভেঙে গেছে। এখন গাড়ি চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে।’
সাবরাং জিরো পয়েন্ট এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘জোয়ারের সময় ঢেউয়ের তোড়ে মেরিন ড্রাইভের কিছু কিছু অংশ ভেঙে পড়েছে। আগে জিও ব্যাগ বসানো হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।’ সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম এলেই ভাঙছে সৈকত। এই ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ জরুরি।’
টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেন, ‘সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় ভাঙন বেশি দেখা দিচ্ছে। এর আগে বাহারছড়ার শীলখালী এলাকায় যেসব জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছিল, তা মেরামত করা হয়েছে।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভ সড়কের কিছু অংশে ভাঙনের খবর পেয়েছি। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’
এদিকে অমাবস্যার জোয়ারের পানি ও সাগরে সৃষ্ট হওয়া লঘুচাপের প্রভাবে সেন্টমার্টিনে প্রায় ২০টি ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। প্লাবিত হয়েছে শতাধিক ঘরবাড়ি। এতে আতঙ্কে রয়েছেন দ্বীপের বাসিন্দারা। গত বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত টানা বৈরী আবহাওয়ার কারণে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রলার চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। দ্বীপে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে শুরু হয়েছে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি। নিরাপত্তার স্বার্থে মাছ ধরার ট্রলারগুলো জেটির আশপাশে নোঙর করে রাখা হয়েছে।
সেন্টমার্টিন পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘টানা বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ দ্বীপের সুরক্ষা বাঁধে আঘাত হানতে শুরু করেছে। সমুদ্রের পানিতে অনেকের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। প্যারাডাইজ নামে তিনতলা বিশিষ্ট একটি রিসোর্ট পানিতে ডুবে আছে। গাছপালা ভেঙে গেছে। বিভিন্ন স্থাপনায় ফাটল ধরেছে।
সেন্টমার্টিন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছৈয়দ আলম বলেন, ‘ঢেউয়ের আঘাতে বাঁধের চারদিকে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন অংশ দিয়ে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে সেন্টমার্টিন দ্বীপ বিলীনের আশঙ্কা রয়েছে।
সেন্টমার্টিন বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে দ্বীপের মানুষ খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংকটে ভুগে। এখন নৌযান বন্ধ থাকায় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। এভাবে বৈরী আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে খাদ্যপণ্য সংকটে ভোগবে দ্বীপবাসী।’
টেকনাফ-সেন্টমার্টিন সার্ভিস ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি রশিদ আহমদ জানান, বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল থাকায় বৃহস্পতিবার থেকে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার নৌযান চালু হবে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘অমাবস্যার জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ায় ১৫-২০টি ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। শতাধিক ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। এতে দ্বীপবাসীর ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় দ্বীপের বাজারে সরবরাহ করা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কমতে শুরু করেছে। এভাবে বৈরী আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে খাদ্যসংকটে ভোগবেন দ্বীপের বাসিন্দারা।