২০ আগস্ট সকাল ৯টা। শরীয়তপুরের নড়িয়া বাংলাবাজার এলাকা থেকে জাহাঙ্গীর আলম নামে এক স্ট্রোকের রোগীকে সদর হাসপাতালে আনা হয়। অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাতে ঢাকায় রেফার করেন। কিন্তু হাসপাতালে তখন কোনো অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত তাকে উন্নত চিকিৎসা ছাড়াই হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে হয়।
শ্বাসকষ্টের রোগী আবদুল খালেক মোল্লা। এসেছেন সদর উপজেলার চিকিন্দী এলাকা থেকে। তাকেও চিকিৎসক ঢাকায় রেফার করেন। কিন্তু তিনিও অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে ঢাকায় যেতে পারছিলেন না। কারণ অ্যাম্বুলেন্স নেই। অন্য জেলা থেকে অ্যাম্বুলেন্স আনা হলে তাদের হুমকি দেওয়া হয়। মারধরের ঘটনাও ঘটে। জেলায় গড়ে ওঠা অ্যাম্বুলেন্সের সিন্ডিকেট এসব কাজ করে। তাদের ভয়ে কোনো গাড়ি রোগী পরিবহন করতে পারে না। শেষমেশ সিন্ডিকেটের চোখ এড়িয়ে অন্য জেলার গাড়িতেই ওই দুই রোগীকে ঢাকায় নেওয়া হয়।
শরীয়তপুরের এই অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। তাদের নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কেউ কম টাকায় রোগী বহন করতে পারে না। অন্য কোনো জেলা থেকে আনা অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী পরিবহন সম্ভব হয় না। সম্প্রতি এই চক্রের বাধায় পড়ে এক নবজাতক মারা যায়। এ ঘটনায় মামলা হলে একজন গ্রেপ্তার হন। কিন্তু এরপরও ভয়াবহ এই সিন্ডিকেটটি ভাঙা সম্ভব হয়নি। উল্টো তারা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় অন্য জেলার একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে নবজাতক শিশুকে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন নূর হোসেন। ডামুড্যা এলাকায় পৌঁছালে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা গতিরোধ করেন। তারা দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখেন। এতে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে শিশুটি মারা যায়। ঘটনার পরদিন ওই নবজাতকের বাবা নুর হোসেন মামলা করেন। এতে সিভিল সার্জনের গাড়িচালক তাহের দেওয়ান, তার ছেলে সবুজ দেওয়ান, জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে অবসরে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্স চালক আবদুল হাই ও স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চালক বিল্লাল হোসেনকে আসামি করা হয়।
এ ঘটনার মূল হোতা সবুজ দেওয়ানকে একদিন পর গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর থেকে জেলার ২১টি অ্যাম্বুলেন্সের সবকটিতেই রোগী পরিবহন কয়েকদিন বন্ধ ছিল। অন্য জেলা থেকে অ্যাম্বুলেন্স এলে হুমকি ও মারধর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সদর হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে একটি সচল আছে। এতে সেবাপ্রত্যাশীরা বিপদে পড়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের গাড়িচালক আবু তাহের দেওয়ান ও সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক জাহাঙ্গীর মিয়া। দুজনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী আবদুল হাই, সবুজ দেওয়ান ও বিল্লাল হোসেন। অভিযোগ আছে, সিন্ডিকেট চক্রের বেঁধে দেওয়া ভাড়া পরিশোধ করে রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে হয়। বাইরের জেলা থেকে অ্যাম্বুলেন্স আসতে হলে এই চক্রের অনুমতি নিতে হয়। স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবসায়ীরাও সিন্ডিকেটের হাত থেকে রেহাই পান না। অনেকে ব্যবসাই ছেড়ে দিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলার একজন সাবেক অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী বলেন, ‘ওই সিন্ডিকেটের কারণে অ্যাম্বুলেন্স বিক্রি করে অন্য ব্যবসায় নেমেছি। এই সিন্ডিকেট বন্ধ করা দরকার।’
সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক জাহাঙ্গীর মিয়া এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘সিভিল সার্জনের গাড়িচালক আবু তাহের দেওয়ানসহ অন্যরা দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। কিছু বললে তারা আমাকে মারতে আসে। তাদের অত্যাচারে গত পাঁচ বছর ধরে আমরা অতিষ্ঠ।’ তবে আবু তাহের দেওয়ান পলাতক থাকায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।
সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার অফিসের চালক আবু তাহের ও সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক জাহাঙ্গীরের নাম সিন্ডিকেটে আসায় তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের বিরুদ্ধে লেখা হবে।’ সিন্ডিকেট ভাঙার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট বিষয় কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। যদি ডিসি-এসপিরা ব্যবস্থা নেন, তাহলে আমরা তাদের সহযোগিতা করব।’
শরীয়তপুর পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযানে নেমেছে। একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্তে দোষী প্রমাণ হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’