উঁচু দেওয়াল দিয়ে ৪টি বসতবাড়ি ঘিরে ফেলে সেখানে বালু ভরাট করে আপেল মাহমুদ নামে এক ব্যবসায়ী নির্মাণ করছেন ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রি। ইতোমধ্যে ইন্ডাস্ট্রির স্ট্রাকচার, বাউন্ডারি দেওয়াল, মূল গেটসহ নানা স্থাপনার নির্মাণকাজ শেষ করেছেন ওই ব্যবসায়ী। ছাউনিসহ অন্যান্য কিছুর কাজ চলমান রয়েছে।
ওই জমিতে প্রায় ৪৫ বছর ধরে বসবাসকারী দিনমজুর ইলিয়াস মোল্লা, তার ভাই সজল মোল্লা, স্বপন ও শিপন মোল্লার পরিবার অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
যাতায়াতে ৪ পরিবারের সদস্যরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বসতবাড়িটি দখলে নিতে ব্যবসায়ী অ্যাডভোকেট আপেল মাহমুদের ছত্রচ্ছায়ায় স্থানীয় সন্ত্রাসী রাসেল বাহিনী হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। এই সন্ত্রাসী বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক মামলা আছে কাশিয়ানীসহ দেশের কয়েকটি থানায়। এই গ্রুপের অন্যতম সদস্য রাসেল কয়েকবার জেল খেটে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও অপকর্ম শুরু করেছেন।
এতে পরিবারগুলোর দিন কাটছে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায়। এ অবস্থা চলছে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার খাগড়াবাড়িয়া গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই গ্রামের খাগড়াবাড়িয়া বিলের মৌজার ৩২ নম্বর খতিয়ানে ৪ একর ৭৫ শতাংশ জমি রয়েছে। এ জমির ১০ আনার মালিক মোল্লা বংশের জাহাঙ্গীর মোল্লাসহ অন্যরা। আর ৬ আনার মালিক ব্যবসায়ী আপেল মাহমুদের মিয়া বংশের লোকজন। মোল্লা বংশ জমি তাদের দখলে রাখতে প্রায় ৪৫ বছর আগে দিনমজুর আউয়াল মোল্লাকে ওই জমিতে বসবাস করতে দেয়। আউয়াল মোল্লা সেখানে ঘর করে বসবাস শুরু করেন।
তিনি জমিও চাষাবাদ করতেন। আউয়াল মোল্লার মৃত্যুর পর তার ৪ ছেলে ইলিয়াস মোল্লা, সজল মোল্লা, স্বপন মোল্লা ও শিপন মোল্লা সেখানে বসবাস করছেন। বিআরএস রেকর্ডের সময় ওই জমি মিয়া বংশের লোকজন পুরোটাই গোপনে তাদের নামে রেকর্ড করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে মোল্লা বংশের জাহাঙ্গীর মোল্লা গোপালগঞ্জের আদালতে রেকর্ড সংশোধনীর একটি মামলা করেছেন। কোর্টে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এরই মধ্যে মোল্লাদের ১ একর ৫০ শতাংশ জমি দখল করে ও আশপাশের প্রায় ৪ একর জমিতে আপেল মাহমুদ বৃহৎ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রি নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ করেছেন জাহাঙ্গীর মোল্লা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জাহাঙ্গীর মোল্লার দাবি করা জমির চারপাশে আরসিসি পিলারের উচ্চ দেওয়াল তুলেছেন ব্যবসায়ী আপেল মাহমুদ। দখলকারীরা উত্তর পোতার ঘর ভেঙে দিয়েছেন। সেখান থেকে শতাধিক গাছ কেটেছেন। পূর্ব পোতায় ৩টি ও পশ্চিম পোতায় ১টি ঘর রয়েছে। ওই ঘরগুলোতে বসবাস করছে ইলিয়াস ও তার ভাইদের পরিবার। এসব ঘর দেওয়াল তুলে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর উত্তর পোতায় আপেল মাহমুদ ইন্ডাস্ট্রির মূল গেট নির্মাণ করেছেন। তার পরই ফ্যাক্টরির সব বিশাল শেড নির্মাণ করেছেন। এই দেয়াল ও স্থাপনা নির্মাণে বালু ভরাটসহ প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা এলাকাবাসীর। দূর থেকে এটিকে বিশাল ইন্ডাস্ট্রি ভবনের মতোই দেখা যায়।
ভুক্তভোগী স্বপন মোল্লার সঙ্গে কথা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার দিনমজুর বাবা প্রায় ৪০-৪৫ বছর আগে জাহাঙ্গীর মোল্লাদের জায়গায় বসবাস শুরু করেন। বাবার মৃত্যুর পর আমরা চার ভাই পরিবার-পরিজন নিয়ে এ জায়গায় বসবাস করছি। কিন্তু হঠাৎ করে আপেল মাহমুদ এ জায়গা তার দাবি করে আমাদের বাড়িঘর উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘিরে যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। বালু ফেলে কারখানা নির্মাণ করছেন। আমরা এখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। বাড়িতে চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে গেছে। পরে আপেল মাহমুদের লোকজন ও আমার বংশের লোকজন মিলে সালিশ বসান। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে আমাদের অন্য কোনো স্থানে বাড়িঘর তৈরি করে দেবেন। আর আমাদের যে জমি রয়েছে সেই জমির পরিবর্তে অন্যস্থানে জমি কিনে দেবেন। আমরা দিনমজুর, তাই এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছি। এর বেশি আর আপনাদের বলতে পারছি না।’
জমির মালিকানা দাবিদার জাহাঙ্গীর মোল্লা বলেন, ‘আরএস রেকর্ডে সাড়ে ৪ একর জমির মধ্যে আমার ১০ আনা জমির মালিকানা রয়েছে। আর ৬ আনার মালিক আপেল মাহমুদরা। বিআরএস রেকর্ডের সময় জরিপকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আপেল মাহমুদদের বাড়িতে থেকে জরিপের কাজ করেছেন। তখন তারা মিয়া বংশের সদস্যদের নামের ওই জমি গোপনে রেকর্ড করে দেন। অথচ ওই জায়গায় আমাদের লোক ইলিয়াসরা বসবাস করছেন। জমি আমাদের দখলে রয়েছে। ওই রেকর্ডের বিরুদ্ধে আমরা রেকর্ড সংশোধনী মামলা করেছি। এর মধ্যে আপেল মাহমুদ আমাদের প্রায় ১ একর ৫০ শতাংশ জমি দখল করে ফ্যাক্টরি বানাচ্ছেন। আমরা বাধা দিতে গেলে তারা প্রভাব খাটিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমাদের লোকদের সরিয়ে দেয়। মামলা চলমান থাকতে আপেল মাহমুদ আমাদের জমি থেকে উচ্ছেদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হওয়ায় বিভিন্ন লোক দিয়ে মামলার ওপর প্রভাব খাটাচ্ছেন।’
প্রধান উপদেষ্টা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, দুর্নীতি দমন কমিশনে আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগে জানা গেছে, ২০০৭ সালের দিকে আপেল মাহমুদ ঢাকায় আগোরায় একটি ছোট চাকরি দিয়ে জীবন শুরু করেন। ২০০৯ সালে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী কিছু নেতা-মন্ত্রীর সান্নিধ্য পান। তারপর তদবির-বাণিজ্য, স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত হন। আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে তিনি ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছেন।
খাগড়াবাড়িয়ার কয়েকজন লোক সাংবাদিকদের বলেন, আগোরার ট্রলিবয় হিসেবে শূন্য হাতে জীবন শুরু করা আপেল ১৫ বছরে প্রায় শতকোটি টাকার অর্থ-সম্পদের মালিক। নিশ্চয়ই আপেলের অদৃশ্য কোনো ব্যবসা রয়েছে। তা না হলে এটা সম্ভব নয়।
খাগড়াবাড়িয়া মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সিরাজ শেখ বলেন, জাহাঙ্গীর মোল্লা ও আপেল মাহমুদের সঙ্গে যে জমি নিয়ে সমস্যা চলছে আমরা তো জানতাম এই জমি ওয়াপদার। কারণ খালপাড়ের অধিকাংশ জমি সরকারি। সরকারি জমি কীভাবে মালিকানায় এল তা আমরা বুঝতে পারছি না।
খাগড়াবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ও ওড়াকান্দি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার সাগর মোল্লা বলেন, ‘আমি জানি আপেল মাহমুদের এই জমিতে ইলিয়াস মোল্লাসহ তার অন্য ভাইয়েরা বসবাস করছেন আমার জন্মের আগে থেকে। এখন জাহাঙ্গীর মোল্লা জমিটি তার বলে দাবি করেন। ইলিয়াস মোল্লারা যে জায়গায় ঘরবাড়ি বানিয়ে বসবাস করছেন সেটি ইলিয়াসের নয়। তার পরও মানবিক কারণে আপেল মাহমুদ তাদের অন্যস্থানে বাড়ি বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’
ইলিয়াস মোল্লার মেয়ে তিশা খানম বলেন, ‘আমরা ঘরবাড়ি তৈরি করে এখানে বসবাস করে আসছি। আমাদের বংশের লোক ও আপেল মাহমুদের লোকজন সালিশ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমাদের অন্যস্থানে বাড়ি বানিয়ে দিবে। আমার বাবা তাতে রাজি হয়েছেন। বাড়ি বানানো শেষ হলে আমরা সেখানে চলে যাব। তার আগে এখানেই থাকব।’
এ সময় ইলিয়াস মোল্লা ও তার স্ত্রী ডাক্তার দেখাতে মুকসুদপুর যাওয়ায় তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। তবে তিনি মুঠোফোনে বলেন, প্রায় ৫০ বছর আগে আমার বাবাকে বাড়ি করে থাকতে জায়গা দিয়েছিল জাহাঙ্গীর মোল্লার বাবা বাবন মোল্লা। সেই থেকে আমরা বসবাস করে আসছি। আমার ভাই-বোন, ছেলে-মেয়েদের জন্ম এই বাড়িতে। এখন জানতে পারি, এই জমি জাহাঙ্গীর মোল্লাদের নেই। মালিক হয়েছেন আপেল মাহমুদ। এই নিয়ে আমার বংশের নিজাম মোল্লা, সাগর মোল্লা, ফায়েক মোল্লা ও ঠান্ডু মোল্লা আমার সঙ্গে বৈঠক বসেছিলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমাকে গ্রামের মধ্যে অন্য কোনো স্থানে বাড়ি করে দিবে। আর প্রজেক্টের মধ্যে আমাদের যে ১৫ কাঠা জমি আছে সমপরিমাণ জমি বাড়ির কাছে কিনে দেবে। এগুলো হলে আমিও এই জায়গা ছেড়ে দেব বলে রাজি হয়েছি।’
এদিকে চলতি বছরের ১২ জুন সাভারের আশুলিয়া থানায় আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে (মামলা নম্বর-৩৭/৩৯৭)। এ মামলায় তাকে ৪৬ নম্বর আসামি করা হলে তিনি কোর্টে যাওয়া বাদ দিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে আপেল মাহমুদের কাছে জানতে মুঠোফোনে কল দিলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওই জায়গা পানি উন্নয়ন বোর্ড অধিগ্রহণ করে। সব জায়গা তাদের কাজে আসেনি। সেখান থেকে এটি অবমুক্ত করে আমরা বিআরএস রেকর্ড করে নিই। তাই জায়গাটি জাহাঙ্গীর মোল্লাদের নয়। ইলিয়াস মোল্লাসহ তার ভাইদের আমার পৈতৃক জায়গায় বসবাস করতে দেওয়া হয়েছিল। এখন এখানে আমরা গুদাম ও ফ্যাক্টরি করছি। এ জন্য ইলিয়াস মোল্লাসহ তার ভাইদের জায়গা ছেড়ে দিতে বলছি। তারা নিম্নআয়ের মানুষ হওয়ায় তাদের অন্য জায়গায় পুনর্বাসিত করার কথা বলেছি।’
আয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে আপেল মাহমুদ বলেন, ‘ছাত্রজীবনে আগোরায় খণ্ডকালীন চাকরি করতাম। এখন আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। পারিবারিকভাবে আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা আছে। ব্যবসার টাকা দিয়ে এখানে এ স্থাপনা করছি।’
তার কোনো অবৈধ ব্যবসা বা কোনো বাহিনী নেই জানিয়ে আপেল মাহমুদ বলেন, ‘জমি থেকে উচ্ছেদের জন্য কাউকে কোনো হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়নি। এটি আমার বিরুদ্ধে একটা অপপ্রচার মাত্র।’
কোনো রাজনীতি করেন না দাবি করে আপেল মাহমুদ বলেন, ‘শুনেছি আমার নামে আদালতে একটি হত্যা মামলা হয়েছে। আমার জুনিয়র আইনজীবীকে বলেছি, এ-সংক্রান্ত কাগজ তুলতে। তবে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই।’