প্রস্তাবিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’ নিয়ে উত্তর ফটিকছড়ির বাসিন্দারা বেশ উচ্ছ্বসিত। অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম ফটিকছড়ির সুয়াবিল এবং নাজিরহাট পৌরসভার একাংশের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, ভুজপুরকে ‘মিডল পয়েন্টে’ আনতে উত্তর উপজেলাকে সাপের আকৃতির মতো লম্বা করে সুয়াবিল এবং নাজিরহাট পৌরসভার একাংশকে সংযোজন করা হচ্ছে। অথচ সুয়াবিল এবং নাজিরহাটে গণশুনানিও হয়নি।
ক্ষোভের কারণ জানতে চাইলে সুয়াবিলের বাসিন্দা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান, হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘ফটিকছড়ি উপজেলার সুয়াবিল ইউনিয়ন থেকে ফটিকছড়ি সদরের দূরত্ব ছয় কিলোমিটার। আর বাগানবাজারের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। নারায়ণহাটের দূরত্বও ৩০ কিলোমিটারের কম নয়। নতুন প্রস্তাবিত ভুজপুর উপজেলা সদর নারায়ণহাট কিংবা বাগানবাজার হলে আমাদের পক্ষে সেখানে গিয়ে সেবা গ্রহণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমরা সদরের সঙ্গে আছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের কেন দূরে ঠেলে দেবে? একটি কুচক্রী মহল সরকারের এই মহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা ও আইনি জটিলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ফটিকছড়ি উপজেলা থেকে নাম কেটে সুয়াবিল ইউনিয়ন ও নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডকে প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সঙ্গে সংযোজন করে প্রস্তাব করেছে। এতে বৃহত্তর সুয়াবিল ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে। কারণ ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার দাবির সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের পাঠানো মূল প্রতিবেদন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফটিকছড়ির সরেজমিন প্রতিবেদনে কোথাও সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার অংশবিশেষের নাম ছিল না। অন্তর্ভুক্তির জন্য জনগণেরও কোনো দাবি ছিল না।’
অন্যদিকে, সুয়াবিল ইউনিয়নের একাংশ এবং নাজিরহাট পৌরসভা ফটিকছড়ি উপজেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সঙ্গে পৌরসভার অংশকে সংযোজন করা হলে দ্বৈত প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হবে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকারি বিধিবদ্ধ আইন রয়েছে, যাতে জনগণের মতামতের প্রাধান্য ও গণশুনানির ব্যবস্থা করা হয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো গণশুনানি না করে সুয়াবিল এলাকার জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে। সুয়াবিল ইউনিয়নের বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও ভুল তথ্য সংযোজন করে মাঠ প্রশাসনকে বিভ্রান্তির জালে আবদ্ধ করা হয়েছে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।’
এদিকে উপজেলা সদর কোথায় হবে, তা নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। একপক্ষ চায় দক্ষিণের ইউনিয়ন সুয়াবিল এবং নাজিরহাট পৌরসভা যুক্ত করে নতুন উপজেলাকে লম্বা করে ভুজপুরে সদর করতে। তবে সচেতন মহলের অভিমত, সব ইউনিয়নের মানুষ সমানভাবে সুবিধা পাওয়ার মতো স্থানেই তা হওয়া উচিত। এই সমস্যা সমাধানে বেশ কয়েকটি গণশুনানিও হয়েছে।
ফটিকছড়ি উত্তরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, তারা যুগ যুগ ধরে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। আজীবন ভোট দিয়েছেন কিন্তু সুফল পাননি। ফটিকছড়ি সদর হাসপাতাল করা হয়েছে হাটহাজারীর কাছে। এই হাসপাতালের সেবা পান মূলত হাটহাজারীর মানুষ। ৯০-এর দশকের আগে উত্তরে কোনো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের উদ্যোগে পরে কিছু স্কুল কলেজ গড়ে উঠলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে উত্তরে শিক্ষার হার অনেক কম। এখানে নেই কোনো সরকারি উচ্চবিদ্যালয় এবং কলেজ। তার ওপর রয়েছে অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা।
নারায়ণহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা ব্যবসায়ী রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘আয়তনের দিক দিয়ে ফটিকছড়ি দেশের অন্যতম বড় উপজেলা। স্বাধীনতার পরেই ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা হওয়া উচিত ছিল। উত্তরের তিন ইউনিয়ন নারায়ণহাট, দাঁতমারা এবং বাগানবাজারের আয়তন বাকি ফটিকছড়ির সমান। যেসব ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলা হচ্ছে তার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে নারায়ণহাট। ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে নারায়ণহাট একটি সমৃদ্ধ জায়গা। সবদিক বিবেচনা করে নারায়ণহাটেই উপজেলা সদর হওয়া উচিত। এখানে দক্ষিণ ফটিকছড়ি থেকে অযথা সুয়াবিল এবং নাজিরহাট পৌরসভাকে টেনে এনে ভুজপুরকে মিডল পয়েন্ট করতে চায় একটি পক্ষ। অথচ ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার প্রথম প্রস্তাবে সুয়াবিল এবং নাজিরহাট পৌরসভার একাংশের কথা ছিল না।
জানতে চাইলে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোজাম্মল হক বলেন, ‘নতুন উপজেলা অনুমোদনের জন্য সাধারণত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার ফাইলটি নিকার অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।’
সুয়াবিল এবং নাজিরহাট পৌরসভাবাসীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ফটিকছড়ি থেকে ফাইল গেছে।’