নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রশিদপুর গ্রামের বাসিন্দা, সৃজনশীল তরুণ কৃষক ইমরান হোসাইন। তিনি তার সৃজনশীলতায় কৃষিজমিতে রোপণ করেছেন পাকিস্তানি লং বাসমতী আর পারপোল রাইস। তবে রয়েছে বিশেষ নৈপুণ্য।
হৃদয়ে বাংলাদেশকে ধারণ করে জাতীয় পতাকার আদলে রোপণ করেছেন ওই দুই জাতের ধানের চারা। বাসমতী ধানগাছ যেন জাতীয় পতাকার সবুজ রং। আর মাঝের লাল বৃত্ত নির্দেশ করছে বেগুনি রঙের পারপোল ধানগাছ। বিষয়টি জানতে পেরে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। তারা ওই কৃষকের সৃষ্টিশীলতা আর দেশপ্রেমের প্রশংসায় কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে এক পলক দেখছেন কৃষককেও। শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি আনন্দে মুখে হাসি ফুটছে দর্শকদের। গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কে এম রাফিউল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাতাসের দোলায় দুলছে ওই জমির ধানগাছগুলো। অপরূপ সেই দৃশ্য। কল্পলোকে মনে হবে, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়ছে পত পত করে। জাতীয় পতাকা দুলছে বাতাসের ছোঁয়ায়।
দর্শনার্থী তানিম আর নাজমুল বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরে নিজের আগ্রহকে দমাতে না পেরে ছুটে এসেছি। সত্যিই অপরূপ।’ আরেক দর্শনার্থী সালাম বলেন, ‘জমির দিকে তাকাতেই প্রথম নজরে আসছে লাল বৃত্তের আদলে রোপণ করা বেগুনি রঙের পারপোল ধানগাছ। দৃষ্টি প্রসারিত করে জমির চারদিকে মাথা ঘোরালে দেখা মিলছে জাতীয় পতাকার সবুজ রং নির্দেশক বাসমতী ধানগাছ। যেন শিল্পীর রং-তুলির নিপুণ আঁচড়ে আঁকা হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। ওই সৃষ্টিশীলতায় যে কারও চোখ জুড়াবে। শ্রদ্ধাবনত করবে সবাইকে।’
কৃষক ইমরান হোসাইন জানান, তিনি বাংলাদেশের একজন গর্বিত নাগরিক। দেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন অপরূপ সৌন্দর্যের প্রিয় বাংলাদেশ। ধারণ করেছেন জাতীয় পতাকাকে।
তিনি আরও জানান, অনেক দিন থেকেই তিনি তার কৃষি পেশার মাধ্যমে দেশকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর স্বপ্ন দেখতেন। এরই ধারাবাহিকতায় খোঁজ করতে থাকেন নানা রঙের ধানগাছ। অবশেষে তার স্বপ্নপূরণে ওই দুই রঙের ধানগাছের সন্ধান পান। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি প্রায় ৪৫ শতক জমিতে ওই দুই জাতের ধানের চারা রোপণ করেন। চারা অবস্থায় রং খুব বেশি না ফুটে উঠলেও ধানগাছের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রং গাঢ় হতে থাকে। একপর্যায়ে ধানগাছের প্রাকৃতিক রঙে ফুটে উঠেছে হৃদয়ে ধারণ করা লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। নিজের চিন্তাশক্তির পূর্ণ প্রতিফলন হওয়ায় তিনি গর্বিত আর আনন্দিত।
তিনি মনে করেন, দেশকে ভালোবাসা শুধু মুখের কথা নয়, কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তা কোটি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়। ওই সৃষ্টিশীলতা তার মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক।
স্থানীয়দের দাবি, ইমরানের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এখন রশিদপুর গ্রামের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন ভিড় জমছে দর্শনার্থীদের। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তার এই সৃজনশীল প্রচেষ্টা। ওই কাজের মাধ্যমে জেলার গণ্ডি পেরিয়ে নানা মানুষের কাছে পরিচিতি পাচ্ছে তাদের জন্মস্থান রশিদপুরের নাম, যা বাধ্য করছে তাদের গর্বিত হতে।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কে এম রাফিউল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে তিনি গত রবিবার বিকেলে দেখতে গিয়েছিলেন ওই সৃজনশীলতা।
অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে সবার কাছে এক নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। হাজারও তরুণ শহিদের রক্তের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশের প্রতি সবার দেশপ্রেম এখন যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ওই কৃষকের অভিনব সৃজনশীলতা মূলত দেশের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধকেই ফুটিয়ে তুলেছে, যা অনুপ্রাণিত করেছে তাকেও। এমন সৃজনশীলতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।’