একসময় দারিদ্র্য ও বেকারত্বে জর্জরিত ছিল সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের মহেশরৌহালী গ্রাম। জীবিকার সন্ধানে অনেককেই এলাকা ছাড়তে হতো। সেই গ্রামই এখন দেশের অন্যতম হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনকেন্দ্র। হাঁসের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মহেশরৌহালী থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ হাঁসের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এই শিল্প ঘিরে বদলে গেছে গ্রামের অর্থনীতি।
প্রায় তিন দশক আগে গ্রামের শাহ আলম কৃত্রিম উপায়ে হাঁসের ডিম ফুটানোর উদ্যোগ নেন। একটি হারিকেন ও ধানের তুষ ব্যবহার করে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন বড় শিল্পে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে গ্রামটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১২০টি হ্যাচারি গড়ে উঠেছে। খামারিদের দাবি, এসব হ্যাচারিতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ লাখ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালে শাহ আলম পরীক্ষামূলকভাবে কৃত্রিম উপায়ে হাঁসের ডিম ফুটানো শুরু করেন। শুরুতে অনেকেই বিষয়টিকে অবিশ্বাসের চোখে দেখলেও দীর্ঘ গবেষণা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি সফলতা পান। তার সেই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে পুরো গ্রামের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।
প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে হারিকেন ও তুষের জায়গা দখল করেছে আধুনিক বৈদ্যুতিক ইনকিউবেটর। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার এখন কোনো না কোনোভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন, পরিচর্যা ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও ডিম সংগ্রহ, বাছাই ও বাচ্চা পরিচর্যার কাজে অংশ নিচ্ছেন।
খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদনকারীরা সাধারণত একদিন বয়সী হাঁসের বাচ্চা প্রতি পিস ৩০ থেকে ৪০ টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। তবে খুচরা বাজারে একই বাচ্চার দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ডিম উৎপাদনের জন্য জনপ্রিয় খাকি ক্যাম্পবেল ও ইন্ডিয়ান রানার জাতের হাঁসের বাচ্চার চাহিদা বেশি থাকায় এসব জাতের দাম তুলনামূলক বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ‘একসময় গ্রামের মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরাত। এখন প্রায় প্রতিটি পরিবার এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সবাই উৎপাদন ও সরবরাহের কাজে ব্যস্ত থাকে।’
উদ্যোক্তা শাহ আলম বলেন, ‘শুরুটা ছিল খুবই কঠিন। মানুষ বিশ্বাসই করত না যে, কৃত্রিম উপায়ে হাঁসের ডিম ফুটিয়ে বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়া সম্ভব। কিন্তু চেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলেই আজ এই অবস্থানে পৌঁছানো গেছে।’ তিনি জানান, এই গ্রামের উৎপাদিত খাকি ক্যাম্পবেল, বেইজিং ও ইন্ডিয়ান রানার জাতের হাঁসের বাচ্চার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
উদ্যোক্তা জামাল উদ্দিন জানান, ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ছোট ইনকিউবেটর দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে দুটি বড় ইনকিউবেটর পরিচালনা করছেন। মাসে প্রায় ৩০ হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে তিনি সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় করছেন।
প্রতিদিন কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, বরিশাল, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা মহেশরৌহালী গ্রামে আসেন। বিশেষ খাঁচায় প্যাকেটজাত করে দেশের প্রায় সব জেলায় সরবরাহ করা হয় এসব হাঁসের বাচ্চা।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, মহেশরৌহালীসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৬০০ খামার গড়ে উঠেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ বাড়ানো গেলে এ শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে।