বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রামের ক্যানসার রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। রোগ নির্ণয়ের জন্য শতকোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে খুবই ধীরগতিতে। প্রকল্পের মেয়াদ আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হলেও এখনো মেশিন স্থাপনের কাজ শুরু হয়নি। নিয়োগ হয়নি জনবলও। এর পর আসবে প্রশিক্ষণের বিষয়। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কাজ যেভাবে চলছে তাতে ২০২৭ সালের শুরুতে সেবা শুরু করতে পারা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে একজন ক্যানসার রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে যে টাকা খরচ হয়, তার চেয়ে বেশি টাকা খরচ হয় আসা-যাওয়া এবং থাকা-খাওয়ার খাতে। সিরিয়াল পেতে বেশি দেরি হলে এই খরচ আরও বেড়ে যায়। দ্বিগুণ খরচ করেও নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরীর ক্যানসার রোগীদের। এই দুর্ভোগ লাঘবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ১০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেয়। প্রকল্পের আওতায় ছয় তলাবিশিষ্ট ভবন, মলিকুলার ল্যাব ও সাইক্লোট্রন সুবিধাসহ পেট-সিটি মেশিন রয়েছে। গত অর্থবছর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ সম্পন্ন হয়নি। প্রকল্প পরিচালক আগামী জুনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করে সেবা দেওয়ার কথা বললেও এখনো মেশিনারিজ স্থাপনের কাজ শুরু হয়নি। তাই প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদের মধ্যেও কাজ শেষ করার আশা দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। চট্টগ্রাম পরামণু শক্তি কমিশনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।
ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সের (ইনমাস) চট্টগ্রামের পরিচালক অধ্যাপক ডা. পবিত্র কুমার ভট্টাচার্য খবরের কাগজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ক্যানসার শনাক্তে অতি জরুরি পেট-সিটি স্ক্যান পরীক্ষার সুযোগ নেই। এর জন্য রোগীকে ঢাকা বা দেশের বাইরে যেতে হয়। আর্থিকভাবে সক্ষম রোগীরা তা পারলেও গরিব-অসহায়রা এ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। তবে এ সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পেট-সিটি হলো এটি বিশেষ ধরনের রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা, যা ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়। অন্যান্য পরীক্ষার চেয়ে এটি আরও বেশি বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করে। এটি ক্যানসারের উপস্থিতি, অবস্থান এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ছে কি না, তা চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করতে পারে। রোগের পর্যায়ক্রম নির্ধারণেও সাহায্য করে। এখানে পেট এবং সিটি স্ক্যান দুটি এক সঙ্গে কাজ করবে। এর ফলে ক্যানসারকে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা যাবে। খরচ পড়বে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই খরচে এই পরীক্ষা করা যায়। রিপোর্ট পাওয়া যাবে এক বা দুই দিন পর।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ এবং সাভারে এক সঙ্গে তিন সাইক্লোট্রন মেশিন বসানোর কাজ চলছে। চট্টগ্রামে একটি, ময়মনসিংহে একটি এবং সাভারে দুটি পেট-সিটি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।
অধ্যাপক ডা. পবিত্র কুমার ভট্টাচার্য বলেন, ‘আগের মতো রেডিওথেরাপি নেই। এখন টার্গেটেড থেরাপির যুগ চলছে। জিনম সিকুয়েন্সর মাধ্যমে কোন জিনে ক্যানসার আছে, সেই জিন শনাক্ত করে টার্গেটেড থেরাপি দেওয়ার সুযোগ আছে। তাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রোগী বেঁচে যাবেন। ইনমাসে জিনম সিকুয়েন্স নিয়েও একটি প্রকল্পের কাজ চলছে।’
ইনমাস পরিচালক আরও বলেন, ‘বর্তমানে রেডিওআইসোটোপ আমরা এখনো তৈরি করি না। সাইক্লোট্রন চালু হলে আইসোটোপ তৈরি করব। আমরা যে আইসোটোপ ‘ফ্লোরিন-১৮’ তৈরি করব, সেটা উৎপাদনের এক ঘণ্টা ১০ মিনিট পর অর্ধেক হয়ে যায়। এটি এই কেমিক্যালের প্রাকৃতিক চরিত্র। কিন্তু এর উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। এই জিনিসটি ঢাকা থেকে আনতে গেলে নিজস্ব হেলিকপ্টার লাগবে। তাও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হব। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সেটা সম্ভব নয়। তাই সাইক্লোট্রন বসাতে হচ্ছে। এটি চালানোর জন্য অনেক প্রশিক্ষিত জনবল লাগবে।’
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. মনজুর আহসান খবরের কাগজকে জানান, আগামী বছরের জুনে সেবা কার্যক্রম শুরু করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ চলছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। জনবল প্রশিক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মেশিনারিজ স্থাপনের পর হয়তো জনবল নিয়োগ হবে। তার পর তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে সরকার। তবে বর্তমানে প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ যাওয়া বন্ধ রয়েছে। ঢাকায় বেশ কয়েকটি হাসপাতালে এই সেবা চালু রয়েছে।’ সেখানে প্রশিক্ষণ নিতে অসুবিধা কোথায়?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঢাকায়ও তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’