চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার মাদার্শা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাদার্শা খালের ওপর ডাম্প ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করে স্বাভাবিক পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ফসলসহ খালের পাড়ের মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন কৃষকের সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক জলাধার। অপরদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন।
জানা যায়, কয়েক দিন ধরে মাদার্শা খালের এক পাড় থেকে মাটি কেটে বিভিন্ন জায়গা ভরাটের জন্য বিক্রি করা হচ্ছে। এই খালের ওপর নির্ভর করে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের কৃষি জমিতে সেচব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভেকু মেশিন ও ডাম্প ট্রাক ব্যবহার করে রাতের আঁধারে খালের পাড় কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে। এতে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং পাড় ঘেঁষা ফসলি জমি ধসে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাদিম নামে এক ব্যক্তি স্থানীয় কয়েকজন লোকের সহযোগিতায় ওই খালের পাড়টির মাটি বিক্রি করছেন। কিন্তু সেখানে স্থানীয় আলী হোসেন নামে এক কৃষকের বাদাম খেত থাকায় সমস্যা দেখা দেয়। পরে কৃষক আলি হোসেন আপত্তি জানানো সত্ত্বেও মাটি কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা জোর করে মাটি কাটা শুরু করেন। একপর্যায়ে ওই কৃষক প্রতিবাদ করলে তারা কৃষককে ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাদার্শা খালের ওপর ডাম্প ট্রাক চলাচলের জন্য রাস্তা তৈরি করে স্বাভাবিক পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়াও এক পাশের পাড় ফসলসহ কেটে মাটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে সেখানে থাকা বাদাম খেতের বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। আবার সেখান থেকে কিছু মাটি দিয়ে মির্জাখীল বাংলাবাজারসংলগ্ন একটি জায়গা ভরাট করা হয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, খালের পাড় কেটে নেওয়ার ফলে শুধু কৃষির ক্ষতিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। খালের গতিপথ পরিবর্তন ও সংকুচিত হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দেবে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা মো. সাইফুদ্দিন বলেন, ‘অবিলম্বে খালের পাড় কাটা বন্ধ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এবং খালের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে খালটির গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাবে এবং এলাকার কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মক সংকটে পড়বে।’
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আলী হোসেন বলেন, ‘ওই খালের পাড়ে আমি বাদামের চাষ করেছি। কিন্তু সেখান থেকে মাটি কেটে বিক্রি করার পর আমার বাদাম খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে তারা আমাকে ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। প্রথমে আমি মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ায় আপত্তি জানিয়েছিলাম। পরে তারা জোর করে মাটি কাটা শুরু করায় আমি ফসলের ক্ষতিপূরণ নিতে বাধ্য হয়েছি। আমি তাদের ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে যতটুকু পর্যন্ত মাটি কাটার সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছি, ততটুকু পর্যন্ত কাটা শেষ হয়েছে।’
খালের পাড়ের মাটি বিক্রি করা নাদিম বলেন, ‘খালের উভয় পাশে আমাদের জমি রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে মাটির বড় স্তূপ তৈরি হয়েছে। ফলে খালের একপাশে থাকা আমাদের জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাই আমি জমির ভাঙন রোধে অপর পাশের মাটি বিক্রি করেছি। আর সেখানে যে কৃষক বাদাম চাষ করেছেন ওই জমিও আমাদের। তিনি আমাদের কাছ থেকে জমি নিয়ে সেখানে বাদামের আবাদ করেছেন।’
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে খালের পাড়ের মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’