নীলফামারী জেলাবাসীর নিরাপদ পানি নিশ্চিতে প্রায় পাঁচ বছর আগে একটি পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়। আধুনিক যন্ত্রাংশের সুযোগ-সুবিধা থাকা দোতলা ভবনটির কাজ শেষ হলে স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও দপ্তরগুলোর সমন্বয়ের অভাবে’ অতি জরুরি এই প্রকল্পটি আজও চালু করা হয়নি। এতে জেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষ নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জেলাবাসীর দাবি, অবিলম্বে শোধনাগারটি চালু করে খাওয়ার পানি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হোক। এতে একদিকে যেমন জেলার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে মানুষের আস্থা ফিরবে। যদিও কেন্দ্রটি আজও চালু না হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়নি। জেলা প্রশাসক অবশ্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সময়ের মধ্যে শোধনাগারটি চালুর আশ্বাস দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ২০ লাখ ৯২ হাজার ৫৬৭ জন মানুষের জন্য আয়রন ও আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি নিশ্চিতে ২০২০-২১ অর্থবছরে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে ২০২০ সালে এ-সংক্রান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ভবন নির্মাণ ও যন্ত্রাংশ সংযোজনের কাজ শেষ হয় ২০২১ সালে। খরচ হয় ৫৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩৩ টাকা। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় পাঁচ বছর। কিন্তু আজও শোধনাগারটি চালু হয়নি।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পানি শোধনাগারের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। কোনো নিরাপত্তাকর্মী নেই। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় শোধনাগারের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি যেমন সুইচ, মোটর, ফিল্টার, পাইপলাইন, রিজার্ভ ট্যাংক, পাম্প গ্যালারি, জেনারেটর ও ট্রান্সফরমার ধীরে ধীরে নষ্ট হতে শুরু করেছে। অনেক যন্ত্রপাতির ওপর জমেছে ধুলার পুরু স্তূপ। কিছু যন্ত্র এখনো বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। দেখে বোঝা যায় এগুলো কখনোই ব্যবহার হয়নি। ভবনটির চারপাশে তৈরি হয়েছে ঘন জঙ্গল, যা সাপ ও কীটপতঙ্গের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে এত বড় একটি প্রকল্প আজও চালু হয়নি। নীলফামারী জেলার অধিকাংশ নলকূপের পানিতে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। দীর্ঘদিন এই পানি পান করলে ত্বকের সমস্যা, পেটের অসুখসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর্সেনিকের ঝুঁকিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অথচ এসব সমস্যার সমাধানে নির্মিত শোধনাগারটি বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে আয়রনযুক্ত পানি ব্যবহার করছেন।
নীলফামারী সদর উপজেলার বাসিন্দা শাহিন শাহ বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন নলকূপের পানি ব্যবহার করি। পানিতে আয়রন বেশি থাকায় কাপড় ধুলে দাগ পড়ে যায়, হাঁড়ি-পাতিল কালচে হয়ে যায়। শুনেছি এখানে একটা পানি শোধনাগার আছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এর কোনো সুবিধা পাইনি। ব্যবহার করা তো দূরের কথা, এমন প্রকল্পের কথা আমাদের কখনো অফিশিয়ালি জানানো হয়নি।’
একই এলাকার বাসিন্দা একরামুল হক বলেন, ‘সরকার কোটি টাকা খরচ করে শোধনাগার বানিয়েছে, অথচ সেটা তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। আমরা সাধারণ মানুষ অসুস্থ হচ্ছি আর শোধনাগার চালু না করায় যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত এটি চালু না হলে পুরো প্রকল্পই অকেজো হয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এন মোহাম্মদ নাঈমুল এহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তবে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নাউরুজ্জান বলেন, ‘আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত পানি শোধনাগারটি চালুর চেষ্টা করব। জনগণের নিরাপদ পানির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাংগঠনিক সম্পাদক নুর আলম বাবু বলেন, ‘শুধু আশ্বাস দিলেই হবে না, দ্রুত কার্যকরের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে সংস্কার করতে হবে। দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো স্থাপনাটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়বে, যা হবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।’