দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ ছাড়া এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট ও নিয়ন্ত্রণহীন দামের কারণে নগরবাসী রীতিমতো বেকায়দায় পড়েছে। এমন পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বিকল্প হিসেবে অনেকেই ইলেকট্রিক চুলা বেছে নিয়েছেন। এতে ইনফ্রারেড ও ইনডাকশন চুলার চাহিদা বেড়ে গেছে। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় চলতি মাসে এসব চুলার বিক্রি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারের গোলাম রসুল মার্কেট, রাইফেলস ক্লাব ইলেকট্রিক মার্কেট, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর ও আগ্রাবাদের বিভিন্ন দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক দিন বিশেষ করে গত সপ্তাহ থেকে ইলেকট্রিক চুলার বিক্রি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিক্রেতারা জানান, আগে যেখানে মাসে সীমিত সংখ্যক ইলেকট্রিক চুলা বিক্রি হতো, বর্তমানে গ্যাসসংকটের কারণে পাইকারিতে বিক্রি দ্বিগুণ বেড়েছে। খুচরায় এর প্রভাব ২০ শতাংশ। আগে যেখানে দিনে ২-৩টি ইলেকট্রিক চুলা বিক্রি হতো, এখন সেখানে ৮-১০টি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
নগরবাসী জানান, দিনে নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টা ছাড়া গ্যাস পাওয়া যায় না, আবার অনেক সময় চাপ এত কম থাকে যে রান্না করা সম্ভব হয় না। ফলে অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলো ইলেকট্রিক চুলাকে সময় সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা আয়েশা আক্তার বলেন, ‘দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকে না। সকাল বা গভীর রাতে গ্যাস পাওয়া গেলেও চাপ এত কম থাকে যে রান্না করা যায় না। তাই বাধ্য হয়েই ইলেকট্রিক চুলা কিনেছি। রাইস কুকার আগে থেকে ছিল। এখন গ্যাসের ওপর ভরসা করে আর বসে থাকতে হবে না। রাইস কুকারেই ভাত রান্না হয়ে যাচ্ছে।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান চকবাজারের এক চাকরিজীবী জেকি আক্তার। তিনি বলেন, ‘অফিসে যাওয়ার আগে রান্না শেষ করতে না পারলে সমস্যা হয়। গ্যাসের ওপর আর ভরসা নেই, তাই ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছি।’
কাজীর দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী কুমকুম আজাদ বলেন, ‘ইলেকট্রিক চুলায় রান্নাঘরে কালো ধোঁয়া বা গ্যাস লিকের ভয় নেই। রান্না তুলনামূলক পরিষ্কার এবং ধোঁয়ামুক্ত। পাশাপাশি ছোট ফ্ল্যাট বা মেসে এটি ব্যবহার করাও সহজ। তবে বিদ্যুৎ বিল কিছুটা বাড়বে।’
রিয়াজউদ্দিন বাজারের গোলাম রসুল মার্কেটের সভাপতি মোহাম্মদ আকবর হোসেন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি ও লাইনে গ্যাস না থাকায় ইলেকট্রিক চুলার চাহিদা ২০ শতাংশের মতো বেড়েছে। এর আগেও গ্যাসসংকটের সময় অনেক পরিবার ইলেকট্রিক চুলা কিনেছিল। তাদের তো এখন আর কিনতে হচ্ছে না। প্রতিটি চুলার দেড় থেকে দুই বছর গ্যারান্টি রয়েছে। সঠিক নিয়মে ব্যবহার করলে নষ্ট হয় না।’
ওই মার্কেটের ‘কিচেন অ্যান্ড ডাইনিং’ নামের একটি দোকানের মালিক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘ইলেকট্রিক চুলা পাইকারি-খুচরা দুভাবেই বিক্রি করা হয়। পাইকারিতেও অর্ডার বেড়েছে। এ ছাড়াও খুচরা আগে যেখানে দুই-তিনটি বিক্রি হতো, এখন পাঁচ থেকে সাতটি বিক্রি হচ্ছে।’
রাইফেল ক্লাব ইলেকট্রিক মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহীদুর রহমান বলেন, প্রতিদিন মানুষ এসে ইলেকট্রিক চুলা খুঁজছে। দোকানদারদের বিক্রিও বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজাজ, এলজি কোম্পানির ইলেকট্রিক চুলা পাওয়া যাচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। নিয়ামা কোম্পানির চুলার দাম পড়ছে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত। ভিশন চুলা পাওয়া যাচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজারের মধ্যে।
ইলেকট্রিক চুলার ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অনেক ভোক্তা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের আশঙ্কা, গ্যাসসংকটের বিকল্প হিসেবে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়ও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম নগরীর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল) মামুনুল বাশরী বলেন, শীতকাল হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা এমনিতে কম। বর্তমানে জেলায় ৬০০ থেকে ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। গরমকালে ১১০০ থেকে ১২০০ মেগাওয়াট প্রয়োজন হয়। তাই শীতকালে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার হলেও বিদ্যুতের মোট চাহিদার ওপর তেমন প্রভাব পড়ছে না। যদি গরমকাল হতো তাহলে প্রভাব পড়ত।