চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সড়কের পাশের উর্বর জমি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন তেমুহানী, পাঠানিপুল, ঢেমশা ও নলুয়া এলাকার কৃষিজমি থেকে এসব মাটি কাটা হয়। বছরজুড়ে এভাবে মাটিকাটার কারণে অনেক জায়গায় বিশালাকৃতির গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে আবাদযোগ্য জমি কমার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দু-একটি ডাম্পট্রাক ও ভেকু মেশিন জব্দ করা হলেও মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। তবে প্রশাসনের দাবি, মাটি কাটা বন্ধে তাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত। এসব অপকর্মে জড়িতড়া অভিযানের খবর পেয়ে আগে থেকেই পালিয়ে যায়, তাই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৭৩টি ইটভাটা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্তত ৫০টির নবায়নকৃত লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। এসব অবৈধ ইটভাটার সিংহভাগই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন তেমুহানী, পাঠানিপুল ও রসুলাবাদ এলাকায় অবস্থিত।
আরও জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুম এলেই তারা ‘প্রশাসনকে ম্যানেজ করে’ মাটি খনন করে থাকে। আবার রাতের আঁধারে বৈদ্যুতিক পাম্প ও শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সেচ দিয়ে জলাশয়গুলো পুনরায় মাটি কাটার উপযোগী করা হয়। এরপর ৪০-৫০টি ডাম্পট্রাক ও ১০-১৫টি ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে সেগুলো ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়। প্রশাসনের অভিযান এড়াতে তারা অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির পাশাপাশি পাহারাদার বসায়।
সাতকানিয়ার মৌলভীর দোকান থেকে কেরানীহাট রেলক্রসিং পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, এক সময়ের কৃষিজমিগুলোতে এখন বড় বড় গর্ত। কেঁওচিয়া ইউনিয়নের নয়াখাল, পাঠানিপুল ও আঁধার মানিক দরগাহর পশ্চিমেও একই অবস্থা। সেখানে আবারও মাটি কাটার জন্য শ্যালো মেশিন বসিয়ে পানি সেচ দেওয়া হচ্ছে। মূলত মাছ আহরণ ও কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার কথা বলে ইটভাটা সংশ্লিষ্টরা কিছু কৃষকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এ কাজটি করে থাকে।
ঢেমশা ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল মজিদ বলেন, ‘আগে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কৃষিজমি থেকে রাতের আঁধারে জোর করে মাটি কেটে নেওয়া হতো। এখন প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে জলাশয় সেচের মাধ্যমে একই কায়দায় মাটি কাটার পরিকল্পনা করছে। এসব মাটিখেকোদের দমন করা এখন সময়ের দাবি।’
কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ জাবেদ বলেন, ‘মাঝেমধ্যে মাটি কাটার খবর পেয়ে প্রশাসন এলে মাটিখেকোরা ভেকু মেশিন ও ডাম্প ট্রাক রেখে পালিয়ে যায়। পরে প্রশাসন নিরুপায় হয়ে সেগুলো বিকল করে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। প্রশাসনের উচিত এগুলোর মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট ইটভাটার মালিককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।’
সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম বলেন, ‘একটি ইটভাটা সচলের জন্য প্রতিবছর শ্রমিকদের অন্তত দেড় কোটি টাকা অগ্রিম দিতে হয়। প্রতিটি ভাটায় অন্তত ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার মাটি লাগে। কেউ বাধ্য হয়ে জলাশয় থেকে মাটি কাটার চেষ্টা করলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসন এসে যন্ত্রাংশ বিকল করে দেয়। এভাবে হয়রানি করার চেয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে ইটভাটাগুলো বন্ধ করে দিলে আমি খুশি হব।’
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা রহমান বলেন, ‘দেদারসে কৃষিজমির মাটি কাটার ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহতের পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জমির প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হয়ে কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। মাটিখেকোদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষিজমির উপরিভাগের কয়েক ইঞ্চি মাটিতে জৈব ও পুষ্টি উপাদান থাকে। এসব উপাদান ফসল উৎপাদনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাটির এই স্তরটি কেটে নেওয়া হলে জমি দীর্ঘ সময়ের জন্য অনুর্বর হয়ে পড়ে, আগের মতো আর ফলন পাওয়া যায় না।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সামছুজ্জামান বলেন, ‘অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাটি কাটার উদ্দেশ্যে যদি পুনরায় জলাশয়গুলো সেচ দেওয়া হয় তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’