রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ২৫টি মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধার করা মরদেহগুলো বুধবার রাত থেকেই রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে রাখা হয়। সেখান থেকে স্বজনরা মরদেহ নিয়ে যায়। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে রয়েছে ছেলে শিশু ৪ জন, মেয়ে শিশু ৩ জন, মহিলা ১১ জন, পুরুষ ৮ জন।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ নিখোঁজ নেই বা কারও স্বজন নিখোঁজ কাউকে খুঁজছে- এমন তথ্য নেই বলে জানিয়েছে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন।
বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ৩নং ঘাটে নদী পাড়ি দিতে অপেক্ষামাণ ঢাকাগামী ‘সৌহাদ্য পরিবহন’ এর একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। রাত ১টা নাগাদ পুরো বাসটি উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা’র ক্রেন দিয়ে টেনে পন্টুনে তোলা হয়।
নিহতরা হলেন রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুরের লালমিয়া সড়কের মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৮নং ওয়ার্ডের মজমপুর গ্রামের মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), কুষ্টিয়া সদরের খাগড়বাড়ীয়া গ্রামের হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), রাজবাড়ী পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা গ্রামের মৃত ডা. আবদুল আলীমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), কাজী মুকুলের ছেলে কাজী সাইফ (৩০), কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ডাকলা ইউনিয়নের চর বারকিপাড়া গ্রামের রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২), রেজাউল করিমের মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার সমাজপুর ইউনিয়নের ধুশুন্দু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনর সন্তান ইস্রাফিল (৩), কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের সন্তান ফাইজ শাহানূর (১১), বালিয়াকান্দি উপজেলার পশ্চিম খালখোলা গ্রামের আরব খানের ছেলে আরমান খান (৩১) গাড়িচালক, কালুখালী উপজেলার মহেন্দ্রপুর ইউনিয়নের বেলগাছি গ্রামের আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা জেসমিন (৩০), রাজবাড়ী সদর উপজেলা মিজানপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের সোবাহান মন্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), বড় চর বেনিনগরের মান্নান মন্ডলের স্ত্রী জোস্ন্যা (৩৫), গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের নোয়োধা গ্রামের মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের মথুয়ারাই গ্রামের মৃত নূর ইসলামের স্ত্রীর নাছিমা (৪০), ঢাকা জেলার আশুলিয়া উপজেলার বাগধুনিয়া পালপাড়া গ্রামের মো. নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার সমসপুর গ্রামের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার কাচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকবাড়িয়া গ্রামের নুরুজ্জামানের ছেলে আরমান(৭ মাস), কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দ্রপুর গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুর রহমান (৬), রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদসি ইউনিয়নের আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), ভবানীপুর ৮নং ওয়ার্ডের ইসমাইল হোসেন খানের ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), কালুখালী উপজেলার মজনুর ছেলে উজ্জল, চরমদাপুরের আফসার মন্ডলের ছেলে আশরাফুল, কালুখালীর সানাউল্লাহের ছেলে জাহাঙ্গীর।
২৬ মরদেহের মধ্যে ২৫টি পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর মো. হাফিজুর রহমান। তিনি আরও জানান, একজন নারীর মরদেহ রয়েছে। তার বাড়ি দিনাজপুরে। স্বজনরা মরদেহ নিতে রওনা দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। বুধবার সোয়া ৫টার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। তারপর স্খানীয়রা উদ্ধার অভিযান শুরু। কিছু সময় পর পাটুরিয়া ঘাটে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। এরপর ডুবুরী দল যাত্রীদের খুঁজতে থাকে। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বিআইডাব্লিউটিসির কর্মকর্তা রাজবাড়ী দুই আসনের সংসদ সদস্য হারুণ অর রশিদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। রাতেই দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন নৌপরিহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান।
একটি কমিটির প্রধান করা হয়েছে রাজবাড়ী জেলার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট। অন্যটির নেতৃত্বে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুহিদুল ইসলাম। দুটি কমিটিকেই তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে দৌলতদিয়ার পদ্মা নদীতে বাসডুবিতে ২৬ জন নিহতের ঘটনায় রাজবাড়ীতে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান সংকুচিত করা হয়। আনন্দের কোনো অনুষ্ঠান রাখা হয়নি। নিহতদের প্রতি শোক জানাতে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এদিকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পাঁচ সদস্য বিশ্ষ্টি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জানা গেছে, দৌলতদিয়াতয় বাসডুবির ঘটনায় ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনের বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। বাকী আটজন কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ঢাকা, গোপালগঞ্জ ও দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা। রাজবাড়ীর ১৮ জনের মধ্যে সদর উপজেলার ৯ জন, গোয়ালন্দের ২ জন, বালিয়াকান্দির ১জন, কালুখালীর ৬ জন রয়েছেন।
নিহতদের পরিবার পাবে আর্থিক সহযোগিতা
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। নৌপুলিশ তাদের সুরতহাল করেছে। বিনা ময়নাতদন্তে ২৫ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকী একজনের বাড়ি দিনাজপুর। ওই মরদেহটি হিমঘরে রাখা আছে। তার স্বজনরা এলে তাদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ নিখোঁজ আছে বলে জানা নেই। কাউকে খোঁজ করতেও দেখেননি বা শোনেননি। জেলা প্রশাসনের ভেরিফাইড ফেসবুকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, কারও স্বজন নিখোঁজ থাকলে যেন যোগাযোগ করে।
যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। ইউএনওদের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য পাঠানো হয়েছে। ইউএনওরা কাজ করছেন। শীঘ্রই যথাসম্ভব তাদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা দেওয়া যায়। সেটাই তারা দেবেন। অন্য জেলার নিহতদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের কাছে তথ্য পাঠানো হয়েছে। তাদের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি গঠন
বাস নদীতে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় রাজবাড়ীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তারিফ-উল-হাসানকে আহ্বায়ক এবং গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাসকে সদস্য সচিব করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাকী তিনজন হলেন রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস), দৌলতদিয়া বিআইডব্লিউটিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক এবং রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, দুর্ঘটনায় বাসডুবির ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল (বুধবার) থেকেই তারা কার্যক্রম শুরু করেছে। তাদেরকে তিন কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জানান, দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান সংকুচিত করা হয়েছে। পুরো জেলাব্যাপী আনন্দের কোনো বিষয় রাখা হয়নি। শুধু যা না করলেই না তা করা হয়েছে। সকালে শহিদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। স্টেডিয়ামে শুধু কুচকাওয়াজ হয়েছে। ডিসপ্লে বা কোনো গান করা হয়নি। খুবই সাধারণভাবে বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। খেলাধুলা আনন্দ আয়োজন সব বন্ধ রাখা হয়েছে।
সুমন/মাহফুজ