চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় রাতের আঁধারে কৃষকের অজান্তে ফসলিজমির উর্বর মাটি বা টপসয়েল কেটে ইটভাটায় পাচারের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে স্থানীয় মাটিখেকো সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে কৃষকরা এখন জমির মাটি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
সম্প্রতি উপজেলার কালিয়াইশ ইউনিয়নের রসুলাবাদ গ্রামের কৃষক মোস্তাক আহমদ সকাল বেলা তার জমিতে গিয়ে ৩২ ফুট গর্ত দেখতে পান। জানতে পারেন আলাউদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী তার ১৬ শতক জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিয়েছে। এ ঘটনায় তিনি আলাউদ্দিনের নামে সাতকানিয়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন।
মোস্তাক আহমদ বলেন, ‘আমি ট্রাক্টর দিয়ে অন্যের জমি চাষের পাশাপাশি নিজে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করি। সম্প্রতি আমি বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলায় ট্রাক্টর দিয়ে মানুষের জমি চাষের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। সেখান থেকে ফিরে এসে বাড়িতে ঘুমাতে যাই। পরদিন সকালে দেখতে পাই, রাতের আঁধারে আমার জমির মাটি কেটে বিক্রি করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি কাজটি আলাউদ্দিন করেছে।’
তিনি বলেন, ‘পরে আলাউদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে ঘটনার প্রতিবাদ করলে তিনি আমাকে মারধরের চেষ্টা করেন। প্রাণনাশের হুমকি দেন। এ মাটি আমাদের বাঁচার ভরসা। পরিবারের খাবারের উৎস। অথচ সেই মাটিই লুট করে নিয়ে গেল। মাটিখেকোদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আমার মতো অন্য কৃষকদেরও একই পরিণতি হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফরিদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন তেমুহানী, পাঠানিপুল, রসুলাবাদ, ঠাকুরদিঘী, নলুয়া, ঢেমশা ও সাতকানিয়া কলেজ রোডে রাত হলেই শুরু হয় এক্সকাভেটর ও ডাম্প ট্রাকের গর্জন। সম্প্রতি মাটি কাটার দুটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে অন্তত অর্ধশতাধিক ডাম্প ট্রাককে ইটভাটার জন্য মাটি পরিবহন করতে দেখা যায়। প্রশাসন কি ভিডিওগুলো দেখে না?’
জিয়াবুল হক নামে ওই এলাকার এক যুবক বলেন, মাটিখেকোদের তাণ্ডবে এখানকার কৃষিজমিগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে। ফসলিজমির পাশাপাশি তারা বড় বড় জলাশয় সেচ দিয়ে মাটি কাটছে। শুরুতে প্রশাসন বাধা দিলেও পরে অন্তরালে চলে গেছে। এসবের ফলে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষ আর আস্থা রাখতে পারছে না। তাই কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাটি ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন বলেন, অভিযোগকারী মোস্তাক আমার চাচাতো ভাই। ওই জায়গা নিয়ে ২৫ বছর ধরে মামলা চলছে। সেখানে তিনি আট শতক জায়গা পাবেন এবং আমিও পাব। তার অংশের মাটি অক্ষত রেখে আমাদের অংশের মাটিগুলো আমরা বিক্রি করেছি। কারণ আমাদের পার্শ্ববর্তী অন্য কৃষকরা তাদের জমির মাটি বিক্রি করে দেওয়ায় আমাদের জমিগুলো ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর মোস্তাক যেহেতু থানায় অভিযোগ দিয়েছেন সেখানে বসে এটি সমাধান করব।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা রহমান বলেন, কিছুদিন আগে পাহাড় রক্ষায় এওচিয়া ইউনিয়নে ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান ও মাটি পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত সড়ক কেটে দেওয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম যে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী ইটভাটাগুলোর ক্ষেত্রে প্রশাসন নমনীয়। বিষয়টি কিন্তু ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষকে ভাবাচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে এ নমনীয়তা ও নীরবতার রহস্য উদঘাটিত হবে।
সাতকানিয়া থানার ওসি মঞ্জুরুল হক বলেন, কৃষকের ফসলিজমির মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ইতোপূর্বে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। এর পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশের একটি টিম পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মাটি কাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনের নমনীয়তা ও নীরবতার বিষয়ে জানতে সম্প্রতি প্রত্যাহার হওয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের ব্যবহৃত সরকারি নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনে সংযোগ না পাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে ৩৫টির অধিক এক্সকাভেটর ও ডাম্প ট্রাক বিকল করা হয়েছে। এছাড়া সম্পূর্ণরূপে মাটি কাটা বন্ধে শিগগিরই নয়াখালের বাঁধ কেটে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।