চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নে অবৈধ ইটভাটার মালিকরা পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। এসব ইটভাটায় পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহের পাশাপাশি ইট পোড়াতে বনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছের কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের জীবন-জীবিকাও অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। এ সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার অভিযান চালানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের নজর এড়াতে রাতের আঁধারে ভেকু মেশিন ও ডাম্প ট্রাক ব্যবহার করে পাহাড় কেটে মাটি সেখান থেকে একটু দূরে স্তূপ করে রাখা হয়। পরে স্তূপ থেকে মাটি নিয়ে কাঁচা ইট প্রস্তুত করা হয়। এর পর জ্বালানি হিসেবে কয়লার পরিবর্তে বনের কাঠ পুড়িয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে ইট তৈরি করে বিক্রি করা হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এওচিয়া ইউনিয়নের ছনখোলা ও চূড়ামণি পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার আশপাশে থাকা একাধিক পাহাড়ের বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। এতে পাহাড়ের পাদদেশে বিশাল আকৃতির গর্ত তৈরি হয়েছে। পাহাড় কেটে সংগ্রহ করা মাটি ইট তৈরির জন্য চুল্লির আশপাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ভাটায় পোড়ানোর জন্য চুল্লির চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বনের কাঠ।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, ‘এখানকার বেশির ভাগ ইটভাটা পাহাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। এসব ভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। এ ছাড়া গ্রামীণ সড়ক দিয়ে ইট ও মাটি পরিবহনের ডাম্প ট্রাক চলাচল করায় বেশির ভাগ সড়ক যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের লাগাম টানা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
জাহেদ হোসাইন নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘এওচিয়ার অধিকাংশ ইটভাটা পাহাড় ও বনাঞ্চল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। ফলে একদিকে যেমন পাহাড় ও টিলা কাটা হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রজাতির কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে পাহাড় ও টিলা ধ্বংসের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে। প্রশাসন অভিযান পরিচালনার আশ্বাস দিলেও কার্যকরী পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।’
সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘স্থানীয় কিছু অসাধু কাঠ ব্যবসায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সামাজিক বনায়ন এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানের গাছ কেটে কাঠ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে সরবরাহ করছে। এতে বন উজাড়ের পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও ধ্বংস হচ্ছে। এ ছাড়াও এসব ইটভাটা অবৈধ হলেও মালিকদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।’
পরিবেশবাদী নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সানজিদা রহমান বলেন, ‘কোনো অনুমোদন ছাড়া পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো গুরুতর অপরাধের শামিল। অথচ এওচিয়া ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা একাধিক ইটভাটা পরিবেশগত ছাড়পত্র বা বৈধ অনুমোদন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে নিশ্চিন্তে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। তাই পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের প্রশাসনের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণা কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বনের কাঠ ব্যবহার ও পাহাড় কেটে ইট তৈরির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের সদিচ্ছার কোনো কমতি নেই। তবে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। তাই কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।’
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘কিছুদিন আগে ওই এলাকায় পাহাড় কাটা বন্ধে বড় ধরনের একটি অভিযান চালানো হয়। ওই সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে মাটি পরিবহনের সুবিধার্থে তৈরি করা বেশ কয়েকটি মাটির সড়ক ভেকু দিয়ে কেটে দেওয়া হয়েছে।’