কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রংপুর নগরীর বাসিন্দাদের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তুলনামূলক নিচু এলাকার সড়ক এরই মধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক বাসা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় সেখানকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। এমনকি মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হচ্ছে।ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্টরা এমন পরিস্থিতির জন্য রংপুর সিটি করপোরেশনের (রমেক) অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন।
রমেকের কর্মকর্তারা অবশ্য নিজেদের অপারগতার কথা স্বীকার করে নিয়ে জানান, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে আগে থেকে কোনো মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া ছিল না। আগামীতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে তাদের পরিকল্পনা সাপেক্ষে এই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হবে। তবে তারা এরই মধ্যে পানি নিষ্কাশনে কাজ শুরু করেছেন।
সরেজিমন ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর বাবুখা, কামারপাড়া, গোমস্তপাড়া, কেরানীপাড়া, মূলাটোল, নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়া, মুন্সীপাড়া, জুম্মাপাড়া, হনুমানতলা, এরশাদ মোড়সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সড়ক ও ঘরবাড়িতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের ঘরে পানি উঠে যায়। বিশেষ করে নিচু ও জলাবদ্ধ এলাকায় শিশু, বৃদ্ধ এবং রোগীদের চলাচলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
কামারপাড়া এলাকার বাসিন্দা জাহিদ হাসানের স্ত্রী কোহিনুর বেগম বলেন, ‘বৃষ্টি বেশি হলেই প্রতিবছর শ্যামাসুন্দরী খাল উপচে নোংরা পানি ঘরে ঢুকে পড়ে। রাস্তা তলিয়ে যায়। খালের ময়লা পরিষ্কার না করায় পানি ঠিকমতো যেতে পারে না। এ বছর ঘরে হাঁটুসমান পানি উঠেছে। খুব কষ্টে আছি।’
শ্যামাসুন্দরী খালের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী গোমস্তপাড়ার বাসিন্দা রতন মিয়া বলেন, ‘রংপুর নগরীর পানি নিষ্কাশনের প্রধান খাল হলো শ্যামাসুন্দরী। খালটির তলদেশ বহু বছর ধরে ভরাট হয়ে আছে। খনন ও সংস্কার না করায় খালটি তার পানির ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই তা উপচে পড়ে আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়।’
লালবাগ এলাকার একটি ছাত্রাবাসে থাকেন কারমাইকেল কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, ‘অল্প বৃষ্টিতেই মেসে পানি ঢুকে যায়। এখানকার হাজার হাজার শিক্ষার্থী তখন বিপদে পড়েন। শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে হলেও সিটি করপোরেশনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রংপুর নগরীর বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কেবল বৈরী আবহাওয়া দায়ী নয়, এটি মূলত দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত নগর উন্নয়নের ফসল। শ্যামাসুন্দরী খাল একসময় শহরের প্রধান জলাধার ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে তা দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে অকেজো হয়ে পড়েছে। খালের যথাযথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজব্যবস্থা নিয়ে কোনো মাস্টারপ্ল্যান করা নেই। ফলে এমনটা হয়েছে। আগামীতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আসতে যাচ্ছে। তারা পরিকল্পনা করলে এই সমস্যার সমাধানে আসবে।’
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান গতকাল শনিবার জানান, গত এক দিনে রংপুরে ৬৮ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ২৫ এপ্রিল থেকে গতকাল পর্যন্ত ২৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাকিব হাসান বলেন, ‘নগরী নিয়ে আগে কোনো মাস্টারপ্ল্যান ছিল না। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। তাদের দুজন অধ্যাপক সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। খুব দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নগরীর কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতার খবর পেয়েছি। এসব স্থানে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কর্মীরা কাজ শুরু করেছেন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা চলছে।’
অন্যদিকে রংপুর সিটি করপোরেশনের (রমেক) নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে রমেকের কোনো সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। সামনে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে তারা পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।’