পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম এলাকায় ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের দুই স্লো-লেনসহ (বাসের যাত্রী ওঠা-নামার স্থান) ফুটপাত দখল করে বসেছে অবৈধ হাট-বাজার। সাঁথিয়ার অন্যতম এই বাণিজ্যিক এলাকায় মহাসড়কের দুই পাশ মিলিয়ে প্রায় হাফ কিমিজুড়ে এই বাজার গড়ে তোলা হয়েছে।
ফলে এ ব্যস্ততম জায়গাটিতে একদিকে সব সময় যানজট লেগে থাকে। অন্যদিকে এই এলাকার ৭-৮ হাজার শিক্ষার্থীসহ পথচারীদের প্রতিদিন চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, ফুটপাতে দোকান বসিয়ে রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন একদল ব্যবসায়ী। এদের কাছ থেকে খাজনার নামে চাঁদাবাজি করে চলেছে একটি চক্র।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-পাবনা মূল মহাসড়কের ওপরই বসেছে কাঁচাবাজার, ফল ও মাংসের প্রায় ২০০ দোকান। অনেক ব্যবসায়ীর মাসিক ঘর ভাড়া নেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও তা বাঁচাতে তারা বেছে নিয়েছেন এই অবৈধ পথ। মহাসড়ক দখলকারী এই ব্যবসায়ীদের অনেকরই দৈনিক আয় ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত, যা বাজারের অনেক বড় ব্যবসায়ীর চেয়েও বেশি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বনগ্রাম বাজারের পুরাতন রূপালী ব্যাংকসংলগ্ন এলাকায় অনেক বছর ধরে নিয়মিত কাঁচাবাজার বসে আসছে। তবে সম্প্রতি কিছু অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় মূল রাস্তা দখল করে রীতিমতো হাট-বাজার বসিয়ে দিয়েছে। এই অবৈধ ব্যবসা নির্বিঘ্ন রাখতে তারা আয়ের একটি অংশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাঁদা দেয়। রাস্তার ওপর বাজার বসার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। স্কুল চলাকালে ভিড় ঠেলে যাতায়াত করতে গিয়ে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
স্থানীয়রা আরও জানান, বনগ্রাম বাজারের ওপর দিয়ে প্রতিদিন বনগ্রাম প্রাইমারি স্কুল, মিয়াপুর হাইস্কুল ও কলেজ, মিয়াপুর দাখিল মাদ্রাসা, ৫-৬টি কিন্ডারগার্টেন, ৪-৫টি প্রাইভেট মাদ্রাসা এবং বনগ্রাম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মিলিয়ে প্রায় ৭-৮ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। ফুটপাত দখল করে দোকান বসায় এবং সড়কে যানজট লেগে থাকায় শিক্ষার্থীদের রাস্তা পার হতে রীতিমতো ‘যুদ্ধ’ করতে হয়। বিশেষ করে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার হাটের দিন পরিস্থিতি চরম রূপ নেয়।
এ বিষয়ে ৮ম শ্রেণির ছাত্রী মারিয়া খাতুন জানায়, রাস্তার ওপর দোকানপাট আর মানুষের ভিড়ের কারণে তাদের স্কুলে যেতে অনেক ভয় লাগে, কারণ সেখানে সব সময় একটা জটলা লেগেই থাকে।
নবম শ্রেণির ছাত্রী আফিফা বলে, হাটের দিন এই রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাস্তার ওপর হাট বসার ফলে যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সামান্য পথ পাড়ি দিতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপচয় হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম পেঁয়াজের হাট হওয়ায় পেঁয়াজ চাষি ও ব্যবসায়ীদের মাল বোঝাই গাড়ি নিয়ে রাস্তা পার হতে হিমশিম খেতে হয়। এখানে অনেক গরুর বড় হাট বসায় খামারি ও ব্যবসায়ীদেরও একই সমস্যা পোহাতে হয়। মহাসড়কের বাসগুলোও দীর্ঘ সময় জটে আটকে থাকে।
হাটুরিয়া এলাকার কৃষক বাচ্চু প্রামাণিক বলেন, ‘যে রাস্তা পার হতে বড়জোর এক মিনিট সময় লাগার কথা, সেখানে আমাদের এক ঘণ্টা ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। রাস্তার ওপর এভাবে বাজার বসালে আমরা কৃষকরা পণ্য নিয়ে রাস্তা পার হব কীভাবে?’
বনগ্রামের বাসিন্দা আ. কুদ্দুস, হাবিবুর রহমান, সাগর হোসেন ও জসীম উদ্দিন জানান, নিয়মিত এই দুর্ভোগের কারণে জরুরি প্রয়োজনে কোনো রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা কৃষি পণ্য সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তারা আরও জানান, মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) একটি সাইনবোর্ড রয়েছে, যেখানে লেখা আছে– সড়কের উভয় পাশের ১০ মিটারের মধ্যে দোকানপাট বা কোনো কিছু রাখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দখলদার ব্যবসায়ীরা সেই সাইনবোর্ডটির ওপরই চালা দিয়ে নির্বিঘ্নে দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে রূপালী ব্যাংক পুরাতন ভবনের কাছ থেকে শুরু করে হাটের সংযোগস্থল পর্যন্ত এই অবৈধ ব্যবসা চলছে। কয়েক বছর আগে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে। পরে আবার এ জায়গা দখল করে বাজার গড়ে তোলা হয়।
মহাসড়কের উপর দোকান বসানো এক ব্যবসায়ি জানান, বাজারে একটি দোকান ঘর নিতে গেলে মাসিক ভাড়া দিতে হয়। এ ছাড়াও বিদ্যুৎ বিলসহ অনেক রকম বাড়তি খরচ লাগে। এ জন্য দোকানভেদে দিনে ৫০-১০০ টাকা চাঁদা দিয়ে তার মতো অনেকেই এমন সহজভাবে দোকান চালাচ্ছেন।
বনগ্রাম বাজারের বেশ কিছু ব্যবসায়ী জানান, বৈধভাবে ব্যবসা করতে গিয়ে অবৈধ দোকানদারদের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক জিনিস রাস্তায় পাওয়া যায় বলে ক্রেতারা অনেক সময় দোকানে আসেন না।
এ বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিজু তামান্না জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। মহাসড়ক ও ফুটপাত দখল করে জনভোগান্তি সৃষ্টির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। দ্রুতই খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী মনসুরুল আজিজ জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না। তিনি তার অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।