আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে গরু চুরি বেড়েছে। গত দুই মাসে জেলাজুড়ে অর্ধশতাধিক গরু চুরির ঘটনায় নিঃস্ব হয়েছেন অনেক প্রান্তিক খামারি।
বিশেষ করে জেলা সদর, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ ও শাহজাদপুরে প্রায় প্রতি রাতেই হানা দিচ্ছে সংঘবদ্ধ চোর চক্র। তারা ঘরের বাইরে থেকে ছিটকিনি দিয়ে গরু চুরি করে ট্রাকে তুলে পালিয়ে যাচ্ছেন। এতে জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সম্পদ রক্ষায় খামারিরা এখন বাধ্য হয়ে লাঠি ও বাঁশি হাতে রাত জেগে গোয়াল পাহারা দিচ্ছেন। পুলিশ প্রশাসন নিরাপত্তা জোরদারের দাবি করেছে। তবে এসব ঘটনায় এখনো কাউকে আটক করতে পারেনি তারা।
স্থানীয়রা বলছেন, এই চোর চক্রকে দ্রুত দমন করা না গেলে সিরাজগঞ্জের খামারিদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, গরু চুরি বন্ধে তারাও বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, গত বুধবার রাতে সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন মো. হাসান শেখের গোয়াল থেকে ৬টি গরু চুরি হয়। এতে ওই গরুর মালিকের প্রায় ১৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখের দীর্ঘদিন ধরে গরুগুলো লালন-পালন করছিলেন। প্রতিদিনের মতো বুধবার রাতেও গরুগুলো গোয়ালে বেঁধে রেখে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়েন। রাতের কোনো একসময় সংঘবদ্ধ চোর চক্র বাড়ির বাইরে থেকে ঘরের ছিটকিনি লাগিয়ে দেন, যাতে পরিবারের সদস্যরা বের হতে না পারেন। পরে তারা গরু নিয়ে পালিয়ে যান।
এ ছাড়া ১০ মে রাতে জেলার উল্লাপাড়ার পূর্বরামকৃষ্ণপুর গ্রামের ময়নুল ইসলামের খামারে একটি গরু চোর চক্র হানা দেয়। সবার মুখে গামছা আর হাতে দেশীয় অস্ত্র। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, চক্রটি একে একে ছয়টি গরু নিয়ে যাচ্ছে।
আরও জানা যায়, গত ৫ মে গভীর রাতে কামারখন্দ উপজেলার বড়কুড়া মালোপাড়া, ছোট কুড়া ও নান্দিনা কামালিয়া গ্রামে এক রাতেই ৯টি গরু চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দা, খামারি, গ্রামপুলিশ ও থানা-পুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। পালাক্রমে রাতভর গোয়াল পাহারা দিচ্ছেন তারা।
জানা গেছে, চোরেরা গভীর রাতে বিশেষ কায়দায় গরু চুরি করছেন এবং সেগুলো সরাতে ট্রাক ব্যবহার করছেন।
সদর উপজেলার ৬টি গরু চুরি শিকার খামারি হাসান শেখ বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে বিক্রির জন্য গরুগুলো প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই গরুগুলো বিক্রি করেই সংসারের ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের খরচ চালানোর পরিকল্পনা ছিল। এক রাতে সব শেষ হয়ে গেল। আমরা প্রশাসনের কাছে গরুগুলো দ্রুত উদ্ধারের দাবি জানাচ্ছি।’
হাসান শেখের স্ত্রী চম্পা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ডাকাতরা আমাদের ঘরের ছিটকানি বাইরে থেকে লাগিয়ে গরুগুলো নিয়ে গেছে। আমরা কিছুই টের পাইনি। এখন আমরা পথে বসে গেছি।’
গরু চুরির শিকার কামারখন্দের বড় কুড়া গ্রামের খামারি রুহুল আমিন জানান, তার খামারে দুটি গাভী, একটি বকনা ও একটি কোরবানির ষাঁড় ছিল। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর ভোরে উঠে দেখেন খামারে একটি গরুও নেই।
এদিকে গরু চুরি ঠেকাতে বাধ্য হয়ে প্রতি রাতেই দল বেঁধে হাতে বাঁশি, লাইট আর লাঠি নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন বিভিন্ন উপজেলার গ্রামের খামারিরা। তাড়াশ উপজেলার দোবিলা গ্রামের বাসিন্দা খামারি তোফাজ্জেল হোসেন ও আব্দুল মতিন বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও বাড়তি লাভের আশায় দেশি কয়েকটি গরু লালন-পালন করছি। চুরি হওয়ার ভয়ে রাত জেগে পাহাড়া দিচ্ছি।’
তবে গরু চুরি রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি চোর চক্রকে ধরতে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয়দের সহায়তায় কমিটি করে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, ‘গরু চুরি রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। পাশাপাশি চোর চক্রকে ধরতে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয়দের সহায়তায় কমিটি গঠন ও বাঁশকল স্থাপন করে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গ্রহণ করা এমন উদ্যোগে ইতোমধ্যে সুফল মিলতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের সক্রিয় অংশগ্রহণে গরু চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবে।