গত কয়েক দিন ধরে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর ভারী বৃষ্টিপাতে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। পানির তীব্র স্রোতে সিরাজগঞ্জের চৌহালী, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী জনপদে শুরু হয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও মানুষের জীবনভর গড়া স্বপ্ন। আর প্রতিটি ভাঙনের সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর দীর্ঘশ্বাস।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যমুনার পানি দ্রুত বাড়লেও এখনো তা বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে পানি
বৃদ্ধি ওঠানামার কারণে ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জানা গেছে, গত কয়েকদিনে চৌহালী উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি প্রায় ৩০০ মিটার ভূমি একসঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়াও নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে অর্ধ শতাধিক বাড়িঘর ও ফসলি জমি এবং খাসপুখুরিয়া ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের শত শত পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও কৃষিজমি এখন হুমকির মুখে।
শুধু চৌহালী নয়, কাজিপুর উপজেলার খাস রাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া, সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চর এবং শাহজাদপুরের গালা ও সনাতনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যমুনার ভাঙন রোধে বিভিন্ন সময়ে জিওব্যাগ ডাম্পিংসহ অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় প্রতিবছরেই নদীপাড়ের মানুষদের বসতভিটা হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার খাস কাউলিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড়, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিনানুই, রেহাই পুখুরিয়া, দেওয়ানগঞ্জ বাজার, চর সলিমাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন চলছে। কোথাও কোথাও কয়েকশ ফুট এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে।
চৌহালী উপজেলার চর সলিমাবাদ গ্রামের অটোরিকশাচালক মোল্লা সাইফুল ইসলাম তিনি একজন ভূমিহীন মানুষ। তার মাথা গোজার ঠাঁই বলতে একমাত্র সম্বল ছিল একটি ছোট্ট বসতঘর। কিন্তু গত (৪ জুন) রাতেই সেই আশ্রয়টুকুও যমুনার ভয়াল ভাঙনে কেড়ে নিয়েছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমি এখন পরিবার নিয়ে খোলা আকাশে নিচে পলিথিন টানিয়ে বসবাস করছি।
সাইফুলের মতো গত তিন সপ্তাহে চৌহালী উপজেলার অন্তত ৬ থেকে ৭টি গ্রামের বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গাছপালা। এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে শত শত পরিবার।
চর সলিমাবাদ এলাকার ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, মাত্র দুই সপ্তাহে তার এলাকায় ৩০টিরও বেশি বাড়ি-ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় রাত কাটাচ্ছে।
চরকানালিয়া গ্রামের আব্দুল মানিকের কণ্ঠে ফুটে ওঠে নদীভাঙনের দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় বাপ-দাদার প্রায় ৫০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন তিনি। কিন্তু যমুনার ধারাবাহিক ভাঙনে সব হারিয়ে এখন হাতে রয়েছে মাত্র কয়েক শতাংশ জমি।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আবেগঘন কণ্ঠে মানিক বলেন, বারবার ঘর করেছি, বারবারই নদীতে নিয়ে গেছে। আমরা আর কিছু চাই না, শুধু একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।
৬০ বছর বয়সী সাবিয়া বেগম কয়েক বছর আগেই হারিয়েছেন নিজের বসতভিটা। নদীর ভাঙন তার জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে নিরাপত্তা ও শান্তি।
তিনি বলেন, আমাদের গ্রাম, বাড়িঘর, জমিজমা সব নদী গিলে খাচ্ছে। ভাঙনের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না। চর সলিমাবাদের গৃহবধূ বিলকিসের কণ্ঠেও একই আকুতি।
নাটুয়ারপাড়ার কৃষক হারুনুর রশিদ, জব্বার আলী ও শামসুল ইসলামসহ আরও অনেকে বলেন, যমুনার পানি বাড়ার ও কমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুশ্চিন্তাও বাড়তে থাকে। বছরের পর বছর ফসলি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। স্থায়ী কোনো সমাধান না থাকায় দুর্ভোগ কমছে না।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে চরাঞ্চলের ভেতরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কোনো প্রকল্প নেই। প্রকল্প অনুমোদন পেলে নদী ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিরাজুল ইসলাম/নাঈম