চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে না দিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। পরবর্তীতে সংগঠনটির নেতারা এনসিটি ইজারা না দেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্বারকলিপি দিয়েছে। সেখানে তারা ৬ দফা দাবিও তুলে ধরেন।
বুধবার (১০ জুন) সকালে জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন তারা।
চট্টগ্রাম স্কপের যুগ্ম সমন্বকায়রী এস কে খোদা তোতনের সভাপতিত্বে এবং স্কপের আরেক যুগ্ম সমন্বয়কারী ইফতেখার কামাল খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি খোরশেদ আলম, বিএফটিইউসির সাধারন সম্পাদক কে এম শহিদুল্লাহ, বিএলএফ এর সভাপতি নুরুল আবছার তৌহিদ, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের হেলাল উদ্দিন কবির, ডক শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম প্রমুখ।
এসময় বক্তারা বলেন, এনসিটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনাল। এটি লাভজনকও বটে। টার্মিনালটি বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শ্রমিক ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল করতে হবে। টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার দাবি জানান তারা।
বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে তারা মিছিল সহকারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছে যান। ডিসির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন নেতারা। স্মারকলিপিতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি, সিসিটি, জিসিবিসহ কোনো টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরকে হস্তান্তরের সকল উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড বা অন্য কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ সংক্রান্ত চলমান আলোচনা ও প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। বন্দর পরিচালনায় দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনবল উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলা ও দমনমূলক কার্যক্রম প্রত্যাহার করতে হবে। চট্টগ্রাম শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের ব্যবস্থা করে তাদের মতামত ও উদ্বেগ সরাসরি শোনার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হবে না—এ মর্মে সরকারের সুস্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করতে হবে।
এর আগে গত ৪ জুন এনসিটি ইস্যুতে দুটি দাপ্তরিক চিঠি ইস্যু করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। প্রথম চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত লেখা চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অথবা নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে সে ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
সেদিন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে পর্যালোচনা করতে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভা শেষে মন্ত্রণালয়ের একই কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠি ইস্যু হয়। ওই চিঠিতে বন্দর চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলা হয়, পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যালোচনার লক্ষ্যে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৪ জুনের সভায় আলোচনা মোতাবেক ওই প্রকল্পের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
তাই বলা যায়, এনসিটি পরিচালনার কাজ দিতে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড এফজেডইর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায় মন্ত্রণালয়। গত ৪ জুনের চিঠিতে এনসিটি পরিচালনায় ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (আইটিও) নিয়োগের লক্ষ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা এগিয়ে নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এনসিটি নিয়ে একই দিন মন্ত্রণালয়ের দুই ধরনের চিঠি ইস্যু হওয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না বন্দরের শ্রমিকনেতা ও কর্মচারীরা। মন্ত্রণালয়ের এমন কাজে তাদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করেছে বলে জানান তারা। তাদের দাবি, তারা বিদেশি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে নন। বে-টার্মিনালের তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার উদ্যোগে কোনো শ্রমিকনেতা ও কর্মচারী আপত্তি জানাননি।
পাশাপাশি পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়েকে দেওয়ার সময়ও কেউ বাধা দেননি। কিন্তু এনসিটি যন্ত্রপাতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। টার্মিনালটির অপারেশনাল কার্যক্রম গতিশীল ও লাভজনক। এই টার্মিনালের সেবার মান নিয়ে বন্দরের কোনো স্টেকহোল্ডার কখনো কোনো অভিযোগ দেননি। তাহলে একটি পূর্ণাঙ্গ, সুসজ্জিত ও লাভজনক টার্মিনাল কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতে হবে?- এটাই তাদের প্রশ্ন।
এসএন/