জমি জবরদখল, জোরপূর্বক বালু ভরাট, গুম, খুন ও লুটপাটের সম্রাট মোগল ওরফে তারিকুল ইসলাম মোঘল। এ যেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তার ভয়ে বছরের পর বছর বাড়ি ছাড়া শতশত পরিবার।
গত বছরের পাঁচই আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে থাকে অপরাধ জগতের সম্রাট মোগল ও তার বাহিনী। কিন্তু বছর না যেতেই স্থানীয় বিএনপির আংশিক নেতাদের সহযোগিতায় ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন এই সন্ত্রাস ও তার বাহিনী। মোটা টাকার বিনিময়ে ছাত্র জনতার ওপর নির্বিচারে হামলা চালানোর মামলা থেকে কৌশলে জামিন নিয়েছেন তিনি।
এলাকা সূত্রে জানা যায়, এক সময়ের চা দোকানি মোগল ছিল হত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। মামারবাড়ি ছোট্ট দোকানে বসে চা বিক্রি করতেন। পরিবারের কেউ মানুষের বাড়িতে কাজ করে, কেউ বা জুট মিল ও টেক্সটাইলে কাজ করতে টেনেটুনে চালাতেন সংসার। হঠাৎ স্থানীয় শ্রমীক নেতা মোক্তার হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় ফুলেফেপে উঠে মোগল ও তার পরিবার। শুরু হয় তার অপরাধ জগৎ। তার বাবা হারুন অর রশীদ ছিলেন সামান্য টেক্সটাইল মিলের কেরানি। হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যায়। কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন। বর্তমানে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বসবাস করছেন বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে কাঞ্চন পৌরসভায় রাম রাজত্ব কায়েম করেছিলেন মোঘল বাহিনী। এ বাহিনীর কথার বাহিরে গেলেই হামলা মামলার স্বীকার হতো নিরীহ লোকজন।
উল্লেখ্য, ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বছর না ঘুরতেই ছলেবলে কৌশলে আবারও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার অপতৎপরতা শুরু করেছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হলেও নানা কায়দায় তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য ৫ আগস্টের পর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রূপগঞ্জে কার নেতৃত্বে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে সেই প্রশ্ন সবার মুখে মুখে। বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। জানা যায়, কাঞ্চন পৌরসভার সাবেক মেয়র ও যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলামের ভাই এবং আওয়ামী সন্ত্রাসী তারিকুল ইসলাম মোঘলই নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুই শতাধিক সশস্ত্র আওয়ামী ক্যাডারকে। আর এই কাজে মোঘলকে অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে তার অন্য তিন ভাই রফিকুল ইসলাম, সফিকুল ইসলাম এবং নজরুল ইসলাম । অপরভাই সাইফুল ইসলাম জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। যে দল ক্ষমতায় থাকুক না কেন তাদের ক্ষমতা চলে সবসময়।
এদের মধ্যে সফিকুল ইসলামের নামে খুন, গুম, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজিসহ ২০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরা গা ঢাকা দিলেও বিএনপির একাংশের সরাসরি মদদে রূপগঞ্জে আওয়ামী সন্ত্রাসী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে মোঘল গং। যদিও বিএনপির অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, পতিত আওয়ামী লীগের ‘ক্যানসার’ হিসেবে পরিচিত মোঘলকে এভাবে ‘পুনর্বাসনের’ সুযোগ করে দেওয়া ঠিক হচ্ছে না।
এ ছাড়াও ওই এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয় আর চাহিদামতো চাঁদা দিতে ব্যর্থ হলেই গুমের শিকার হতে হত ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঞ্চন পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামের ভাই মোঘল এখন যুবলীগ নেতা থেকে বিএনপির ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে। অথচ তার অতীত কর্মকাণ্ড ছিল কট্টর বিএনপিবিরোধী।
রূপগঞ্জ থানা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৪ এপ্রিল প্রতারণার অভিযোগে মোঘলের নামে নারায়ণগঞ্জ আদালতে দুটি সিআর মামলা করা হয়, মামলা দুটি এখনও তদন্তনাধীন রয়েছে। এ ছাড়া রূপগঞ্জ থানায় ২০২৩ সালেও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তার নামে একটি মামলা (মামলা নং-৩১৬) দায়ের হয়। তার বিরুদ্ধে বাছির হত্যা মামলা, বাদশা মেয়রকে হত্যাচেষ্টা ও আবুল বাশার মেয়রকে মারধরের অভিযোগেও রূপগঞ্জ থানায় মামলা রয়েছে। এ ছাড়াও একই থানায় তার নামে ২০০৯ সালে মারামারির অভিযোগে অপর একটি মামলা (মামলা নং-৩৯) দায়ের করেন এক ভুক্তভোগী।
স্থানীয় সূত্র জানায়, অন্তত দেড় ডজন মামলার আসামি হওয়ার পরও প্রতিবারই মোঘল থেকেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হওয়ার সুবাদে ও বড় ভাই মেয়র হওয়ার কারণেও সে প্রতিবার পার পেয়েছে। পুলিশের কাছেও পেয়েছে বাড়তি সুবিধা। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাহান ভূঁইয়ার অত্যন্ত কাছের ও বিশ্বস্ত লোক ছিলেন মোঘল। অথচ একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা ছিল তার।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ভূমিদস্যুতার মাধ্যমে মোঘল এখন শতকোটি টাকার মালিক হয়েছে। চলাফেরা করে বিলাসবহুল গাড়িতে। বসবাসের জন্য তৈরি করেছে প্রাসাদের মতো বাড়ি। বানিয়েছে চোখধাঁধানো ডিজাইনের বাগানবাড়ি। যেখানে নিয়মিত বসে আনন্দ জলসা। অথচ দৃশ্যমান কোনো আয় না থাকলেও খাসজমি দখল, অন্যের জমি জবরদখল করে বিক্রি করাই মোঘলের প্রধান কাজ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঞ্চন পৌর এলাকায় মোঘল বাহিনীর রয়েছে অবৈধ অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার। দেশি-বিদেশি পিস্তল, শটগান, দা-ছুরিসহ নানা অস্ত্রে সজ্জিত থাকে এই বাহিনী। মোঘলের ফাঁসির দাবিতে কাঞ্চন এলাকায় বহুবার বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন হয়েছে। মোঘলের ছোট ভাই শফির বিরুদ্ধেও রয়েছে ট্রিপল মার্ডারের অভিযোগ।
সম্প্রতি মোঘল দেশে ফেরায় আতঙ্কে দিন পার করছেন স্থানীয়রা। যদিও তার ভয়ে এখনও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ অনেকেই। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, কেন্দুয়া এলাকায় তৈরি মোঘলের সুরম্য অট্টালিকা সবার নজর কাড়ে। বাইরে নামফলকে লেখা ‘তাওহিদ নূর প্রাসাদ’। হোল্ডিং নম্বর-০১৭৬০০। দেশে ফেরার পর তাকে ওই বাড়িতে বসবাস করতে দেখা না গেলেও গভীর রাতে সেখানে তার আসা-যাওয়া রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
কাঞ্চন পৌর এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোঘলের বাহিনীতে রয়েছে অবৈধ অস্ত্রধারী দুই শতাধিক ক্যাডার। তার ক্যাডার বাহিনীর ভয়ে তটস্থ ওই এলাকার মানুষ। মোঘলের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগেরও শেষ নেই। কাঞ্চন পৌর এলাকা ও কেন্দুয়ার মানুষ যেন এই মোঘল ‘সাম্রাজ্য’-এর প্রজা!
এই অপরাধী নানা যোগসাজশের মাধ্যমে স্থায়ী জামিন লাভেরও অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সুমন/