মা-বাবার সঙ্গে ঈদের শপিং করতে গেল তনয়। রংবেরঙের জিনিসপাতি দেখে আনন্দে আটখানা সে। এদিকে তাকিয়ে থাকে। ওদিকে তাকিয়ে থাকে। কখনো বা নাচতে থাকে। সবকিছুই যেন পছন্দ হয়েছে ওর।
বাবা বললেন, তুমি কী কী কিনতে চাও?
তনয় বলল, সবকিছু কিনতে চাই।
বাবা বললেন, সব তো কেনা যাবে না সোনা বাবা।
তনয় বলল, সব কেনা যাবে না কেন?
বাবা বললেন, সব দিয়ে আমরা কী করব? আমাদের যেটা যেটা দরকার, সেটা সেটা কিনতে হবে।
না বাবা, আমি সব কিনব, সব।
মা একটু রাগ মেশানো গলায় বললেন, তুমি কিন্তু বেশি কথা বলছ তনয়।
তনয় মানুষদের দেখিয়ে অভিযোগ করে বলল, দেখো মা, দেখো, কত মানুষে কত কথা বলছে। তাদের মা-বাবা তো রাগ করছে না।
তনয়ের কথা শুনে মা-বাবা দুজনেই হাসলেন। তারপর তনয়কে নিয়ে জুতার দোকানে গেলেন। তনয়ের জন্য কেনা হলো লাল টুকটুকে একজোড়া জুতা। হাঁটলেই লালবাতি জ্বলে। বাঁশি বাজে প্যা পো পো। এমন জুতা পেয়ে ওর নাচানাচি আরও বেড়ে গেল।
তারপর কিনে দেওয়া হলো রঙিন পায়জামা-পাঞ্জাবি। টুপি। খুশবু। রঙিন কাচের রোদচশমা। ঘড়ি। কিনে দেওয়া হলো ঝুনঝুনি। আরও অনেক কিছু। মা-বাবাও কিনলেন জামাকাপড়। দরকারি জিনিসপাতি।
সব শেষে মা বললেন, তোমার আরও কিছু লাগবে তনয়?
তনয় বলল, একটা জিনিস লাগবে মা। আমাকে একটা ঈদ কিনে দাও। খুব সুন্দর একটা ঈদ চাই।
মায়ের তো মাথায় হাত। বাবাও অবাক। এ কী বলছে ছেলেটা!
মা বললেন, ঈদ কেনা যায় না বাবা। ঈদ এমনিতেই আসবে। মাত্র তিনটা দিন বাকি।
আমাকে ঈদ কিনে দিতেই হবে। ঈদ না নিয়ে আমি বাড়ি যাব না। বলেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল তনয়।
বাবা বললেন, সামনের বছর তোমাকে ইশকুলে ভর্তি করে দেব। তুমি অনেক বড় হয়েছ। এমন কথা বললে তুমি ইশকুলে পড়তে যাবে কেমন করে? শোনো বাবা, তোমার মায়ের কথাই ঠিক। ঈদ কেনার জিনিস নয়। ঈদ হচ্ছে খুশির দিন। এমনিতেই আসে। আকাশে কাস্তে বাঁকা রুপার চাঁদের হাসি দেখে খুশিতে হাসতে হাসতে ঈদ আসে। আর মাত্র তিন দিন পরেই আসবে রঙিন ঈদ। খুশির ঈদ।
বাবার কথায় শান্ত হলো তনয়।
ঘটনা একটা ঘটল ঈদের দিন ভোরবেলা। তনয়কে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘুম থেকে উঠেই হাওয়া।
এ-ঘর, ও-ঘর, এমনকি উঠানের এপাশে ওপাশে কোথাও নেই। মা তনয়কে গোসল করিয়ে নতুন জামাকাপড় পরিয়ে দেবে। বাবার সঙ্গে তনয় যাবে ঈদগাহে। কিন্তু তনয় নেই। কোথায় যাবে এই ছোট্ট খোকা? মা কাঁদতে কাঁদতে ডাকতে লাগলেন, কই গেলি তনয়? আমার সোনা বাবা, কই গেলি তুই?
বাবা ভেজা চোখে খুঁজতে বেরোলেন তনয়কে। তনয়দের বাড়ি থেকে বড় রাস্তার দিকে একটা পথ চলে গেছে। বাবা সেই পথ দিয়ে দৌড়ে যেতে লাগলেন। কিছুদূর গিয়েই হঠাৎ থেমে গেলেন। দেখলেন, পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে তনয়। জিজ্ঞেস করলেন, এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছ কেন তুমি?
তনয় বলল, তোমরা না বলেছ, আজ ঈদ আসবে। তাই তো এখানে দাঁড়িয়ে আছি। এই পথ দিয়ে নানা-নানু আসে। মামা আসে। ঈদও এখান দিয়েই আসবে। ঈদ এলে তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি যাব। ঈদ আসছে না কেন বাবা?
তনয়ের কথা শুনে বাবা একেবারে হাসতে হাসতে কুটিকুটি। বললেন, বাড়ি চলো তনয়। আমাদের ঈদ এসে গেছে। বাড়ি গিয়ে গোসল করব। তারপর ফিরনি-পায়েস খাব। তারপর নতুন জামা-জুতা পরে ঈদগাহে যাব। নামাজ পড়ব। সেখানে রঙিন রঙিন জামাকাপড় পরে আরও কত মানুষ আসবে!
ঈদ এসেছে! ঈদ এসেছে! এই কথা বলতে বলতে, নাচতে নাচতে বাবার সঙ্গে বাড়ির দিকে ছুটল তনয়।