দেশে এবার ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুসারে, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উৎপাদনের মাইলফলক। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু উদ্বৃত্ত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে আলুচাষে ৩ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাষের জমি বৃদ্ধি এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে জনপ্রিয় এই সবজিটির উৎপাদন বেড়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে চার লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। এতে মোট উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ১৫ লাখ টনে পৌঁছেছে। সে বছর ১ কোটি ৬ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন জানায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই সংগঠনের ৩৩৯টি সদস্য প্রতিষ্ঠানে আলু ছিল ২৩ লাখ ৭৮ হাজার, ৮৫৭ মেট্রিক টন। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী সংরক্ষিত আলুতে ব্যবসায়ী ও চাষিদের লোকসান হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।
আলুর বাজারের এ লোকসান কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজছে সরকার। সম্প্রতি রাজধানীর গাবতলীর বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বিভিন্ন গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকেন্দ্র পরিদর্শনকালে কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, এ বছর উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকরা আলুর দাম পাচ্ছেন না। তাদের ক্ষতি কমাতে সরকারিভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকারিভাবে কিছু আলু কেনা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছর বাজারে আলুর চাহিদা কম থাকায় অধিকাংশ হিমাগারে এখনো ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আলু আছে। বৃহত্তর বগুড়া কোল্ড স্টোর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘এ বছর অধিকাংশ চাষি হিমাগারে আলু রেখেছেন। ব্যবসায়ীরাও রেখেছেন। ব্যবসায়ীদের লাভ না হওয়ায় এবার বিক্রির জন্য হিমাগার থেকে আলু নেওয়া হচ্ছে কম। এ খাতের লোকসান কাটিয়ে উঠতে সরকারকে চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আলু কেনার পরামর্শ দিয়েছি। সরকার আলু কিনে টিসিবিকে এবং সরকারের অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের জন্য রেশন হিসেবে দিতে পারে।’
এবার আলুর দাম পড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বলেন, ‘সারা দেশেই আলুর উৎপাদন এবার বেশি হয়েছে। সরবরাহ বাড়ায় বাজারে চাহিদা কমে গেছে। হিমাগারে এখনো পড়ে আছে হাজার হাজার বস্তা আলু।’
নর্দান কোল্ড স্টোরেজের স্টোর কিপার মোহাম্মদ বাপ্পি বলেন, ‘এ মৌসুমে আমাদের এখানে ৬০ কেজির ১ লাখ ৫০ হাজার বস্তা আলু উঠেছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চাষি আর ব্যবসায়ীরা নিয়েছেন ৭৬ হাজার বস্তা। বাজারে চাহিদা থাকার কারণে গত বছর একই সময়ে ৯৫ হাজার বস্তা আলু বাজারে নেওয়া হয়।’
হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, হিমাগার গেটে সরকার আলুর কেজি ২২ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়ার পর ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন দাম বাড়বে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় দাম বাড়েনি। বিভিন্ন হিমাগারের গেটে আলু এলাকাভেদে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকা।
দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ আলু উৎপাদনকারী জেলা মুন্সীগঞ্জ। এখানে ৩৪ হাজার ৭৫৮ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১০ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৬০ হাজার ১১৯ মেটিক টন বেশি উৎপাদন হয়েছে। সরকারি হিসাবে এই জেলায় প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৭ টাকা।
হিমাগারে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে হয়েছে ২৭ টাকা। মুন্সীগঞ্জে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মান ও এলাকাভেদে ৮ টাকা থেকে ১০ টাকা দামে। এবার প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে চাষি ও ব্যবসায়ীদের খরচ হয়েছে ৬ টাকা ৫০ পয়সার কিছু বেশি, যা আগের বছরের চেয়ে বেশি।
আলু ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নর্দান কোল্ড স্টোরেজে আলু রেখেছি ১৮ হাজার ৬০০ বস্তার বেশি। বাজারে দাম না বাড়লে লোকসান হবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি। আমার অবস্থা এমন- মানসম্মানের ভয়ে ভিক্ষাও করতে পারছি না, লোন আছে ২৫ লাখ টাকা আর নিজের পুঁজি গেছে প্রায় পুরোটাই।’
জয়পুরহাটের আলু ব্যবসায়ী মীর শহীদ বলেন, ‘হিমাগারে আলু রেখেছি ১ হাজার ৪৫০ বস্তা। মৌসুমের শেষ দিকে আলুর দাম কিছুটা কম ছিল তখন কিনেছি বলে লোকসান কিছুটা কম হয়েছে কিন্তু তারপরও বস্তায় লোকসান হচ্ছে গড়ে ৭০০ টাকা।’ একই উপজেলার করিমপুর গ্রামের আলুচাষি গাজীউল হক বলেন, ‘বাজারদর এভাবে পড়তির দিকে থাকলে আমার লোকসান হবে দুই লাখ টাকা।’
শুধু সাধারণ আলুই নয়, বীজ আলুর দামও এবার কমেছে প্রতি কেজিতে গড়ে ৬০ শতাংশ। বীজ আলুর ব্যবসায়ী মো. শফিকুল ইসলামের বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। বগুড়ায় ভালো মানের বীজ আলু পাওয়া যায় বলেই তিনি বরাবরই বগুড়া থেকে সংগ্রহ করেন। গত বছর কত করে কিনেছিলেন- এ প্রশ্নের জবাবে মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর যে বীজ আলু কিনেছি প্রায় ৪ হাজার টাকা দামে সেই একই মানের আলু এ বছর পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৩০০ টাকায়।’
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘কৃষকের কাছে এখন আর কোনো আলু নেই। সব হিমাগারে আছে। এবার চাষ বেশি হয়েছে। ফলে অনেক বেশি পরিমাণ আলু উদ্বৃত্ত থেকে যাবে। আলুর দাম এখনো উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। প্রতি কেজি আলু পাইকারি ১৪-১৫ টাকা দামেও বিক্রি হচ্ছে না। খুচরাতে ২০ থেকে ২৫ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। অথচ হিমাগার, পরিবহন, উৎপাদন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ২৫-২৭ টাকা পড়ে যাচ্ছে।’
বাংলাদেশ ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় খুচরা বাজারে আলুর দাম প্রতি কেজি ২০-৩৫ টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৮ শতাংশ কম।
বিবিএসএ খাদ্যবান্ধব এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে প্রতিটি পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে আলু অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।