ইরানের ওপর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রখ্যাত জ্বালানি গবেষণা সংস্থা রাইস্ট্যাড এনার্জি এক পর্যালোচনায় জানিয়েছে, আজ সোমবার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি অন্তত ২০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
রাইস্ট্যাড এনার্জির মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমন্বিতভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছে। ইরানও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় আকারে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সরবরাহ রুট বা উৎপাদন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করে বাড়তে পারে। ইরানের তেল সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে বিশ্বে অপরিশোধিত তেলের দাম ৯০ থেকে ১১০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। ইকুইরাস সিকিউরিটিজের
এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করে, যা বিশ্ব বাজারের প্রায় ৩ শতাংশ। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, সরবরাহের মাত্র ১ শতাংশ ব্যাহত হলে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত তেলের দাম বাড়তে পারে। এর ফলে ক্রুড তেলের দাম ৯.১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।
ইরান এখনো বিশ্বের শীর্ষ ১০ তেল উৎপাদনকারী দেশের একটি। ১৯৭৪ সালে তারা দৈনিক ৬০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের পর তৃতীয় স্থানে ছিল।
দিনে ইরানের উৎপাদন প্রায় ৩১ লাখ ব্যারেল। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে, যা বিশ্বে মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। এর আগে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস বলেছিল, ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তামূল্যে এর বড় প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে খাদ্য, পোশাক ও রাসায়নিকের মতো পণ্যে।
মাত্র ৫০ কিলোমিটার প্রস্থ ও তুলনামূলক অগভীর হওয়ায় হরমুজ প্রণালি কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আংশিক বিঘ্ন ঘটলেও ব্যারেলপ্রতি ২০ থেকে ৪০ ডলারের ‘ভূ-রাজনৈতিক প্রিমিয়াম’ যুক্ত হতে পারে। ফলে তেলের দাম আবারও ৯৫ থেকে ১১০ ডলার বা তারও বেশি হওয়ার শঙ্কা আছে।
কয়েক দিন ধরেই তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আবার হামলা চালাবে–তা একরকম অনুমেয়ই ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন বৃদ্ধি শুরু হওয়ার পরই তেলের দামে তার প্রভাব পড়তে শুরু করে। এরপর অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। সারা বিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল ও এলএনজি পরিবহন হয়, তার বড় অংশই হয় এই প্রণালি দিয়ে। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত গ্যাস পরিবহন হয় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এটি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এর এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ফলে ইরানকে ঘিরে যেকোনো সংঘাতে এই প্রণালি কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই রুট দিয়ে বিশ্ববাজারে ঢুকত যা বর্তমানে থমকে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে তেলের বিকল্প অবকাঠামো ব্যবহার করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাজারে প্রতিদিন ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেল তেলের নিট ঘাটতি থেকে যাবে।
সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, যদি রবিবার বিকেলের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতির কোনো বিশ্বাসযোগ্য সংকেত না পাওয়া যায়, তবে সোমবার সকালে বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তেলের দাম এক লাফে বিশাল উচ্চতায় পৌঁছাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
তেলের দাম ২০ ডলার বৃদ্ধি পেলে পরিবহন খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বিশ্বজুড়ে হু হু করে বেড়ে যেতে পারে, যা নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করছে।