দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা বিরাজমান। ঠিক এমনই এক পরিস্থিতিতে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও সুধী সমাজের সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। এমন কী সফরত মার্কিন প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলও সংলাপের ওপরই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার ব্যাপারে মতামত দিয়ে দেশের বিশিষ্টজনরা বলেছেন সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে সংলাপের বিকল্প নেই।
আমরা লক্ষ্য করেছি, নির্বাচন আয়োজনে ব্যস্ত নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তারা সার্বিক প্রস্তুতি শেষে আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা দিতে পারে বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কাজ পুরোদমে এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। দফায় দফায় বৈঠক, মতবিনিময় কর্মশালাসহ নানা কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নির্বাচন কমিশনাররা। ইতিমধ্যে নির্বাচনী প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ হয়েছে। নির্বাচনী প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাকাটার বিষয়টিও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এদিকে আগামী নির্বাচন উপলক্ষে ডিসি ও ইউএনওদের জন্য জিপগাড়ি কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সবকিছু পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকার নির্বাচনের দিকেই এগোচ্ছে।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য চলতি সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সেক্ষেত্রে ১ নভেম্বর শুরু হচ্ছে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা। আর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভোট গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে সব প্রস্তুতি সারছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল ‘খবরের কাগজ’ এর সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ভোটে কারচুপি বন্ধ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে জনগণ, রাজনীতিবিদ, প্রার্থী, নির্বাচন কর্মকর্তা, পুলিশ, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রত্যাশিত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার সিভিল অ্যাভিয়েশন মাঠে এক জনসভায় বলেছেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচন হবেই। জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দেবে। মানুষ ভোট দিলে তিনি ক্ষমতায় থাকবেন, না দিলে নেই। আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার মন্তব্য করেছেন, ‘কে এল, কে এল না তা নয়, জনগণ ভোট দিলেই বড় সফলতা।’ এবারের সংসদ নির্বাচনে ৪৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশ নিতে পারবে। ইসি বলছে, আমাদের রাজনৈতিক সংলাপে সব দলকে লিখিত পত্র দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কিন্তু তেমন সাড়া পাইনি। পাশাপাশি অন্য দলগুলোর মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তারা সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সেমিনার করছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) নেতারা বলছেন, ‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জাতীয় সরকার গঠন একমাত্র সমাধান।’ খেলাফত মজলিসের নেতারা বলেছেন, ‘দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে।’
আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংকটের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদ্যমান সংকট নিরসনে নাগরিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আয়োজন করেছে নির্বাচনী সংলাপ। এটি কতটুকু ফলপ্রসূ হবে ভাববার বিষয়। নির্বাচনকালীন সময়ে কী ধরনের সরকার থাকবে এটি নিয়েই এখন বড় সংকট। বিএনপি বলছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, অপরদিকে সরকার চাইছে বর্তমান সাংবিধানিক উপায়েই সম্পন্ন হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বিএনপি অনড় অবস্থানে থাকায় তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমান সরকার কাঠামোর মধ্যে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না । রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব মহলের এখন এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুটি কী শেষ পর্যন্ত গণভোটের দিকে গড়াবে; নাকি সংঘাতের দিকে যাবে। তবে জানা যাচ্ছে যে, বড় দুই দলের সমঝোতার বিষয়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের জন্য যুক্তরাষ্টসহ পশ্চিমা বিশ্বের চাপ রয়েছে দুই দলের ওপর। রাজপথে শক্তি প্রদর্শন হুমকি- ধমকি সবই নির্বাচনকে ঘিরে চলছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি দলগুলোর আসা উচিত আলোচনার টেবিলে। আমরা আগেও দেখেছি এ ধরনের সংকট অনেকটাই সংলাপের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। ভোটের আগে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনী মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) তৈরি করা ভীষণ দরকার। রাজনৈতিক অঙ্গনে দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট সাংঘর্ষিক অবস্থার নিরসনই এখন মুখ্য বিষয়।
আলোচনায় যখন এসেছে সংলাপ, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত একটি নির্বাচন করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। এবং একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির আগ্রাসন বহু আগে থেকেই এদেশে প্রচলিত ছিল এবং এখনো আছে। এভাবে ইতিপূর্বে স্বৈরশাসনের আবির্ভাব ঘটেছে। তৃতীয় পক্ষের শক্তির একটা উন্মাদনা তৈরি হতে দেখা গেছে। যা আমাদের দেশের জন্য কল্যাণকর কখনো হয়নি। সাধারণ জনগণ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশে কোনো অরাজকতা বা বাইরের দেশগুলোর নেতিবাচক প্রভাব আসুক সেটা প্রত্যাশা করে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মেঘ অচিরেই কেটে যাক, সেটা সবাই প্রত্যাশা করে।