বিশ্ব খাদ্য দিবস ছিল গত সোমবার, এ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘পানিই জীবন, পানিই খাদ্য’। কাউকে পেছনে ফেলে এগোনো যাবে না। দিবসটির উদ্দেশ্য- ক্ষুধা সমস্যা মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়ানো ও সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়া এবং সবার জন্য পুষ্টিকর খাদ্যে গুরুত্ব দেওয়া।
দিবসটিকে ঘিরে সভা, সেমিনার কর্মসূচি হয়েছে, কিন্তু এই দিবসের জন্য আয়োজন যতটা ঘটা করে হয়, বাস্তবে ততটা প্রতিফলিত হতে দেখা যায় না। মনুষ্যসৃষ্ট কারণেই হোক বা প্রাকৃতিক কারণেই হোক আমাদের খাদ্যচক্রকে প্রতিনিয়তই অনিরাপদ করে তুলছে। ধরিত্রীর মাটি, পানি, বায়ু সবই যেন আমরা বিষাক্ত করে তোলার এক নীরব প্রতিযোগিতায় মেতেছি।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (এফএও) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, বিশ্বের মাত্র ২ দশমিক ৫ ভাগ পানি, পানীয়, কৃষি এবং শিল্পে ব্যবহারের উপযুক্ত। পানি হলো মানুষ, অর্থনীতি ও প্রকৃতির চালিকাশক্তি এবং খাদ্যের ভিত্তি। কৃষিতে মিঠা পানির ৭২ ভাগ ব্যবহার হওয়ায় তা পানযোগ্য পানির ওপর প্রভাব ফেলে।
এ নিবন্ধে আরও বলা হয়- বিশ্বে প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ জলজ খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পানির দূষণ, বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয়, সংরক্ষণশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব পড়ছে জলজ খাদ্যের টেকসই ব্যবস্থাপনায়।
বিশ্ব খাদ্য দিবসে গত মোমবার খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘খাবারে চার ধাতুর বিষ’। দেশে দিন দিন ভয়ানক সব জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ক্যানসার, কিডনি বিকল, স্নায়ু অকার্যকর হওয়া, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়া, উচ্চ-রক্তচাপের মতো রোগগুলোর বিস্তার কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। এসব রোগে যেমন মৃত্যু বাড়ছে, তেমনি চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে কোটি রোগীর পরিবার। আর এসব জটিল রোগের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই দায়ী করা হচ্ছে নিত্যদিনের খাদ্যচক্রে থাকা বিষাক্ত ভারী ধাতুকে। বিশেষ করে পুষ্টিকর খাদ্যের তালিকায় থাকা মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, শাকসবজি, ফলমূলে সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু নিয়ে উদ্বেগের কমতি নেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
পত্রিকায় খবর আসে আর্সেনিক নিয়ে, কিন্তু অন্যান্য বিষাক্ত ধাতু নিয়ে আলোচনা বা খবর তেমন একটা হয় না। যখন কোনো গবেষণা হয় তখনই উঠে আসে মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক নানা ধরনের রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতির তথ্য। মানুষ তখন এসব খাদ্য নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। সম্প্রতি গবেষণায় মাছ, মুরগির মাংস ও ডিমে বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
আমাদের দেশে যে পরিমাণ ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য, ব্যাটারি ও অন্যান্য দ্রব্য যেখানে সেখানে ফেলা হচ্ছে- যা মাটি, পানি ও বাতাসেও খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করছে। এভাবেই মানুষ দিন দিন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি বা পরিশোধনের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। উন্নত দেশগুলো অনেক আগে থেকেই সচেতন, তাদের বর্জ্যব্যবস্থাপনাও অনেক জোরালো।
আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জার্নাল স্প্রিংগারে প্রকাশ পাওয়া গবেষণাপত্রে ঢাকার বিভিন্ন কাঁচাবাজার থেকে সংগ্রহ করা শাকসবজির নমুনাতেও ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও সিসা পাওয়া যায়। এ গবেষণার ফলাফল অনুসারে শাকে ভারী ধাতুর উপস্থিতি অন্য সব সবজির তুলনায় বেশি পাওয়া যায়। ধান ও ধানের ভুসিতে একইরকম ভারী ধাতুর উপস্থিতি। এমনকি পানি, চাল, মুরগি, ডিমেও আর্সেনিকের উপস্থিতি আমাদের উদ্বেগের কারণ।
বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব ভারী ধাতুই প্রধানত ক্যানসারের জন্য দায়ী বা ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া কিডনি বিকল, স্নায়ুর জটিলতা বৃদ্ধির কারণও এসব ধাতু। দেশে এসব রোগ রীতিমতো মহামারি পর্যায়ে চলছে। কিন্তু এর উৎস বন্ধে মানুষের যেমন সচেতনতা নেই, তেমনি নেই কোনো নিজস্ব মানদণ্ড বা কার্যকর ব্যবস্থাপনা। ফলে আমাদের এই ভারী ধাতুর বিপদ থেকে রক্ষা নেই।’
খাদ্যচক্রকে নিরাপদ করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন আমাদের মাটি, পানি ও বাতাসকে দূষণমুক্ত করা। এ জন্য জনসচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশকে নির্মূল রাখার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। কারণ ধরিত্রীকে সংরক্ষণ করার দায়িত্ব আমাদের সবার।