অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনই একসময় ফিলিস্তিনিদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। তাদের মুক্তির দরজা বন্ধ হতে থাকে তখন থেকেই। মাতৃভূমির মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চান ফিলিস্তিনিরা, যা বহুদিন ধরে শ্বাসরোধের চেষ্টায় রয়েছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনিরা তাদের ভূখণ্ড ও মানচিত্রকে পবিত্র মনে করেন। যেকোনো মূল্যে তারা এটি রক্ষা করতে চান। যুদ্ধ কখনো শান্তি বয়ে আনে না। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামা চলছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশুরা।
ধ্বংসস্তূপের নিচে ফিলিস্তিনিদের খোঁজে স্বজনরা। ফ্রিজে গাদা করে রাখা হচ্ছে লাশ। জ্বালানি সংকট ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে গাজার হাসপাতালগুলো মর্গ হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসকরা চরম দিশাহারা অবস্থায় রয়েছেন। এমনি অবস্থা যখন বিরাজ করছে, ঠিক সে সময়েই আল আহলি আরব হাসপাতালে তাণ্ডব চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এ ঘটনাকে ‘একবিংশ শতাব্দীতে চিকিৎসাকেন্দ্রে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হামলা’ বলে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবিক সংস্থা মেডগ্লোবালের জাহের সাহলুল। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে বোমা হামলা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এটি যুদ্ধাপরাধ এবং ১৫০ বছরের পুরোনো জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন।’
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান বলেছেন, ‘গাজায় এ নজিরবিহীন বর্বরতা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে আমি মানবজাতির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ আল জাজিরার সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, ‘হাসপাতাল, স্কুল, অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বোমা হামলা চালিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন গণহত্যা আমরা আর দেখিনি।’
গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে আইডিএফ মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিচার্ড হেচর্ট দাবি করেন, তার বাহিনী কেবল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই বোমা ছুড়ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ জানায়, ইসরায়েলের হামলায় নিহতদের মধ্যে ৬০০-এর বেশি শিশু।
বিমান হামলায় বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় বেসামরিক লোকজনকে ১ কোটি ডলার মানবিক সহায়তা দেবে জাপান। এ দেশ আশা করছে, শিগগিরই এ যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটবে। বর্তমান সংঘাত পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েল সফর করলেন। ইসরায়েল সফররত অবস্থায় বাইডেনের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করলেন তিন আরব নেতা। ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন এবং গাজায় সশস্ত্র স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করতেই তার এ সফর।
ধ্বংসস্তূপের নিচে ফিলিস্তিনি শিশুদের আর্তচিৎকার বিশ্ববিবেককে কি নাড়া দেবে। যুদ্ধ চাই না, চাই শান্তি। চরম মানবেতর ও অসহনীয় দিন যাপন করছে গাজার ২২ লাখেরও বেশি মানুষ। ‘খবরের কাগজ’-এর তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহের সংঘাতে গাজায় নিহতের সংখা ৩ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। সংঘাত সংক্রমিত হয়েছে লেবানন সীমান্তে। এ সংঘাত আরও এগিয়ে নিয়ে বড় ধরনের যুদ্ধের সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়া যায় না। স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার জন্য বহুদিন ধরে লড়াই করছে তারা। ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের এই দীর্ঘদিনের বিরোধিতা কোথায় গিয়ে ঠেকবে!
ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের মুখে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ঢল নামার শঙ্কা রয়েছে। ৭৫ বছরের শরণার্থী সংকট, পশ্চিম তীরে ৫৬ বছরের দখলদারিত্ব এবং ১৬ বছরের গাজা অবরোধের শেষ কি বিশ্ব মোড়লরা প্রত্যাশা করেন না। ফিলিস্তিনে নির্বিচারে চলছে গুলি ও বোমা। পথের পাশে যেখানে সেখানে পড়ে আছে মানব শরীরের ছিন্নভিন্ন অংশ। ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের কান্না ভেসে আসছে। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় হত্যাযজ্ঞের খবর মানুষের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে, কিন্তু এ সংঘাত থামানোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য সমাধান বিশ্ব মোড়লরা দিতে পারছেন না। বরং এটিকে জাগিয়ে রেখে বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন তারা।
ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূলের প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের। ইসলায়েলের নির্বিচার বোমা হামলায় গাজার অভ্যন্তরে বাস্তচ্যুত হয়েছে ১০ লাখ ফিলিস্তিনি। এদিকে ইসরায়েলি হামলা চলতে থাকলে প্রতিরোধ বাহিনীকে কেউ থামাতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি। গাজায় যুদ্ধবিরতি চেয়ে উত্থাপিত রাশিয়ার প্রস্তাব বাতিল করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। এই মুহূর্তে যদি গাজা ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ বন্ধ না হয়, তাহলে চরম মানবিক বিপর্যয় পৃথিবীবাসী প্রত্যক্ষ করবে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী ও শিশু। আমরা কোনো যুদ্ধ চাই না। আমি একজন নারী রাজনীতিক বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন মা হিসেবে বিশ্ব নেতাদের কাছে অনুরোধ করব, আপনারা বন্ধ করেন এ যুদ্ধ। বন্ধ করেন অস্ত্রের খেলা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা।’
ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। গাজায় হামলা বন্ধ করে মানুষের শান্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। বাঁচতে দিতে হবে প্রাণগুলোকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ইসরায়েল এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দের আলোচনার টেবিলে বসে এখনই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে হবে। কয়েক দশক ধরে বয়ে চলা রক্তপ্রবাহ থামাতে হবে। গণহত্যা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দুই রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐকমত্যে পৌঁছতে পারে, তাহলে সেটিই হবে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে শান্তিতে বসবাসের উত্তম পথ।