মধ্যবিত্তের আজ করুণ দশা। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অসহনীয় মাত্রায়। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। সেই সঙ্গে খাদ্যদ্রব্যসহ সবরকম উপকরণ ও সেবার মূল্যও যেন সমানতালে বাড়ার প্রতিযোগিতায় মেতেছে।
ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি অনেকটাই কমে এসেছিল; কিন্তু করোনার ধাক্কা, বৈশ্বিক অস্থিতিশীল অবস্থার কারণে এগুলো আর সেই অবস্থায় নেই। টিসিবির ট্রাকের সামনে এখন শুধু নিম্নবিত্তই নন, লাইন দীর্ঘায়িত করছেন মধ্যবিত্তরাও। বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। মধ্যবিত্তের কষ্টটা একটু বেশিই। চক্ষুলজ্জায় অনেক কিছুই তারা করতে পারেন না। খাদ্যতালিকা তাদের ছোট করতে হয়। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন, আবার অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, সব ধরনের শাকসবজির দাম গড়ে প্রায় ৬০ থেকে ১০০ টাকার ওপরে। অনেকে ইতোমধ্যে সবজি খাওয়াই কমিয়ে দিয়েছেন। খাদ্যের বাইরে অন্যান্য পণ্যের দামও লাগামছাড়া। চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের আজ নাভিশ্বাস। বাড়তি ব্যয়ের চাপ কোনোভাবেই সামাল দিতে পারছেন না তারা। সংসার চালানোই যেন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এক নিদারুণ কষ্টে জীবনযাপন করছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাধারণ মানুষ ও নিম্নবিত্তের জন্য কম দামে চাল, সাশ্রয়ী দামে টিসিবি পণ্য বিতরণসহ নানা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু থাকলেও মধ্যবিত্তের জন্য তেমন কিছুই নেই। তারা না পারেন কারও কাছে হাত পাততে, লোকলজ্জার ভয়ে না পারেন লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রাক থেকে টিসিবির পণ্য কিনতে। বুকের চাপা কষ্ট নিজের মধ্যেই পুষে রাখেন। আর নীরবে-নিঃশব্দে জীবন নির্বাহ করেন। প্রতিদিনই খরচ বাড়ছে। ‘আর পারছি না…’ এমন হতাশার কথা বললেন বেসরকারি চাকরিজীবী মাহির ইসলাম। তিনি ‘খবরের কাগজ’কে বলেন, ‘৪০ হাজার টাকা বেতন পাই। দাম বাড়ার কারণে কষ্টে আছি। কাকে বলব এই কষ্টের কথা!’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ‘খবরের কাগজ’কে বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ডলার সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক পণ্যের সংকট হয়েছে। এ কারণে দেশের বাজারে দাম বাড়ছে। তবে দাম যত বাড়ার কথা, অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে বেড়েছে তার চেয়ে বেশি। এতে সাধারণ মানুষের কষ্ট অনেক বেড়েছে।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দাম বাড়ার ধারা কমছে না। যত দিন যাচ্ছে ততই দাম বাড়ছে। কম আয়ের মানুষ কষ্টে আছেন। কষ্টে আছেন মধ্যবিত্তরা। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে এসব মানুষ নিজেদের আর্থিক সংকটের কথা বলার সুযোগ পান না।’
শুধু খাবারের দামই নয়, বাসা ভাড়া, সন্তানের স্কুলের বেতন, ওষুধ, রিকশা ভাড়া সবই নাগালের বাইরে। কষ্ট-দুর্ভোগও বেড়েছে সমানতালে। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আব্দুল্লায়ে মেক বলেন, ‘মানুষের আয় বৃদ্ধির চেয়ে খাবারের দাম বেশি বেড়েছে, যা এ দেশের বহু পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।’
অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। অভিযোগ আছে, পণ্য ঘাটতির অজুহাতে পর্যাপ্ত পণ্য থাকার পরও একটি চক্র তা গুদামজাত করে বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে ৬-৭ কোটি মানুষ চরম সংকটে রয়েছে। সরকার সারা দেশে ১ কোটি মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী টিসিবির মাধ্যমে বিতরণের ব্যবস্থা করেছে, এর পরিধি আরও বাড়াতে হবে।
উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত পণ্যগুলো বিভিন্নভাবে হাত বদল হয়। বিদ্যমান বাজারব্যবস্থা মনিটরিং করার জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে ওপর পর্যন্ত কাজ করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সালমান/