জাতির জন্য রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার দিন ছিল শুক্রবার (১৩ জুন)। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের লন্ডন বৈঠকের দিকে তাকিয়ে ছিল দেশ।
শুক্রবার তারা পূর্বনির্ধারিত বহুল আলোচিত লন্ডন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, অত্যন্ত সৌহার্দ্যমূলক পরিবেশে অধ্যাপক ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার কাছে আগামী বছরের রমজানের আগে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব করেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও মনে করেন ওই সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভালো হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনি আগামী বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালের রমজান শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহেও নির্বাচনের আয়োজন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে। তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার এই অবস্থানকে স্বাগত জানান এবং তার দলের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানান। প্রধান উপদেষ্টাও তারেক রহমানকে ফলপ্রসূ আলোচনার জন্য ধন্যবাদ জানান।
সবদিক থেকে বিবেচনা করলে এই বিবৃতিটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক বার্তা বয়ে এনেছে। বৈঠকটি এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন দেশ অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের পথে অগ্রসর হচ্ছিল। অনেক দিন ধরেই একদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচনি রোডম্যাপসহ এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছিল। তাদের এই দাবির মুখে প্রধান উপদেষ্টা গত ৭ জুন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী বছরের এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধের যেকোনো দিন অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপি এর তীব্র আপত্তি জানিয়েছে এবং তাদের আগের দাবিতে অটল থেকেছে। দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকে চলা বাদানুবাদ বিতর্ক তিক্ততায় পর্যবসিত হয়। বিশেষ করে বিএনপির পক্ষ থেকে এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে নির্বাচন আদায়ের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে তারা আন্দোলনে যেতে পারে। এর পরই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন বিএনপির শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে সেই প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হলো লন্ডনের ‘ওয়ান টু ওয়ান’ রুদ্ধদ্বার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক।
সংস্কার ও অন্যান্য ইস্যুতে আমরা কয়েক মাস ধরে যেসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, এই বৈঠকটি সে রকম ছিল না। এটি ছিল রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের বৈঠক। পর্যবেক্ষকরা বলছিলেন, দেশে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, তার নিরসন কোন পথে হবে, এই বৈঠকের ফলাফলের ওপর তা নির্ভর করছে। পাশাপাশি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক, রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন ইস্যু, জুলাই সনদসহ অনেক কিছু নির্ভর করছিল গতকালের বৈঠকের ওপর। সেই সঙ্গে দেশ ও দেশের রাজনীতি সংঘাতের পথে এগোবে নাকি স্বস্তি আসবে, জনমনে সেই প্রশ্নও ছিল। কয়েক মাস ধরে মাঝে মাঝেই জনজীবনে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার অবসান ঘটলে সেই অস্থিরতাও কেটে যাবে বলে রাজনীতিবিদরা মনে করছেন।
আমরা মনে করি, এখন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সম্পর্কে দুই নেতা একমত হওয়ায় (শিডিউল ঘোষিত হবে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে) নির্বাচন ঘিরে যে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, সেসবের অবসান ঘটবে। জনজীবনে ফিরে আসবে স্বস্তি। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরবে। অর্থনীতিসহ জাতীয় নানা কর্মকাণ্ডে গতির সঞ্চার হবে। সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে।
ড. ইউনূস ও তারেক রহমান যেহেতু বিবৃতি দিয়ে নির্বাচনের সময় নিয়ে একমত হয়েছেন, এখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের নির্দেশনা অনুসারে যথাসময়ে নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা। সরকারও এ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা করা যায়। যে লক্ষ্য অর্জনের কথা যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা করা হয়েছে, আশা করব তা অর্জিত হবে। ঘোষিত সময়ে অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সেদিক থেকে ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের লন্ডন বৈঠকটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। বৈঠকটি যে বার্তা নিয়ে এল, এখন সেই ফলাফলকে ইতিবাচক এগিয়ে নেওয়ার মধ্যেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সব পক্ষ দেশকে সেই পথেই এগিয়ে নেবে বলে প্রত্যাশা করছি।