বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অচলায়তন বেশ কয়েকবার আলোচনায় এসেছে। সর্বশেষ গত বুধবার সকালে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করা হয়েছে। এর আগে গত রবিবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তলব করে ভারতের হাইকমিশনার প্রণব ভার্মাকে। এ পরিস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈরিতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন। দুই দিনের ব্যবধানে দুই দেশের হাইকমিশনারকে তলবের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের ‘ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি’ নিয়ে নয়াদিল্লির গভীর উদ্বেগ জানাতে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করা হয়।
দিল্লিতে তলবের আগে ঢাকায় ভিসা সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেয় ভারত। এক প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলা জানায়, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঢাকায় কিছু চরমপন্থি গোষ্ঠী যেভাবে ভারতীয় দূতাবাসকে ঘিরে নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করেছে, সে কারণেই রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ১৬ মাস ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক দিনে অর্থাৎ তফসিল ঘোষণার পর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচনের বিপক্ষে বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার করা হয়। এ ছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। হাদির ওপর গুলিবর্ষণকারী ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে দেশে ব্যাপক আলোচনা হয়। এ পরিস্থিতিতে ভারতের হাইকমিশনারকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশ-বিরোধী কর্মকাণ্ডের দ্রুত অবসান চায় ঢাকা। হাদির হত্যাচেষ্টায় জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদেরও ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানায় ঢাকা।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারত নসিহত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ভারতের এ অযাচিত নসিহত অগ্রহণযোগ্য। আমরা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এজন্য প্রতিবেশীদের থেকে কোনো নসিহত গ্রহণের প্রয়োজন নেই। সম্প্রতি এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ মন্তব্য করেছেন ভারত যদি বাংলাদেশের শত্রুদের তাদের ভূখণ্ডে আশ্রয় দেয় তাহলে বাংলাদেশও ভারতবিরোধী শক্তিগুলোকে আশ্রয় দিয়ে সেভেন সিস্টার্সকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইবে। উত্তর-পূর্ব ভারত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য দিল্লির চোখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি ইস্যু। এ মন্তব্যকে ভারত খুবই ‘প্ররোচনামূলক’ বলে মনে করছে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং বহুমাত্রিক। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ধরনের উসকানিতে পা দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট করা যাবে না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীকে এ দেশের মাটি থেকে হটিয়ে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করেছে। এরপর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কাজেই ভারতের সঙ্গে বিতর্কে না গিয়ে নিজেদের বিজয়কে সমুন্নত রাখার বিষয়ে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। পাল্টাপাল্টি মন্তব্য দুই দেশের মধ্যে বৈরিতা সৃষ্টি করবে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের উচিত সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে বৈরিতা সৃষ্টি হয় এমন ধরনের মন্তব্য না করা। বাংলাদেশ যখন একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দিকে হাঁটছে সেদিকেই মনোযোগ নিবদ্ধ রাখা উচিত। নির্বাচনের সামনে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে। তাই সতর্ক ও সংযত থেকে দেশকে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সরকারকে সহযোগিতা করা সবার দায়িত্ব।