বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কার্ড প্রদানের বিষয়টি ছিল বিএনপি সরকারের অন্যতম নির্বাচনি অঙ্গীকার। গতকাল সেই অঙ্গীকার পূরণের সূচনা ঘটালেন সরকারপ্রধান।
নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের এই ফ্যামিলি কার্ড সর্বজনীন একটি প্রকল্প। প্রাথমিকভাবে সরকার ১৪টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রথমে ৩ লাখ ২০ হাজার পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে। প্রথম ধাপে আগামী জুন মাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারের হাতে কার্ডটি তুলে দেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে ১০ হাজার পরিবার এই কার্ড পাবে। এপ্রিল মাসে ১০ হাজার, মে মাসে আরও ১০ হাজার এবং জুন মাসে বাকি ১০ হাজার পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাবে। পরিবারে থাকা মা অথবা নারীপ্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করবে সরকার।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মহাখালীর কড়াইল বস্তি এলাকাসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘নতুন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। এ অনুষ্ঠানে ১৭ জন নারীপ্রধানের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর সরকারপ্রধান ল্যাপটপের একটি বাটন চাপেন, সঙ্গে সঙ্গে উপকারীভোগীদের কাছে নগদ অর্থ চলে যায়।
প্রকল্প বিবরণীতে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডে নাগরিকের সব ধরনের তথ্য থাকবে। তবে এই কার্ডের লক্ষ্য শুধু নগদ অর্থ প্রদান নয়, ২০৩০ সালের মধ্যে এই কার্ডকে সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ডে রূপান্তর করা হবে। অর্থাৎ এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের সার্বিক সামাজিক উন্নয়নের আওতায় নিয়ে আসা হবে। আমরা সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। ১৮ কোটি জনসংখ্যা-অধ্যুষিত বাংলাদেশে পরিবারের সংখ্যা ৪ কোটি ৩০ লাখের মতো। ২০২৫ সালের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ৯.৩ শতাংশ জনগোষ্ঠী হতদরিদ্র, যা সংখ্যায় প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখের মতো। বিশ্বব্যাংক ও একটি স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুসারে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই হার ৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৯.৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দারিদ্র্যের এই ক্রমবৃদ্ধি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ দরিদ্র মানুষ মুদ্রাস্ফীতির চাপে দিশেহারা। এ রকম সময়ে ফ্যামিলি কার্ড তাদের অনেকটা স্বস্তি দেবে। সরকার ইতোমধ্যে জানিয়েছে ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি আগের বয়স্ক ও দুস্থ ভাতাও চালু থাকবে। ফলে বিপুলসংখ্যক পরিবার আর্থিকভাবে আগের তুলনায় পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে আরও স্বস্তিতে থাকবে।
সরকার গঠনের ২১ দিনের মাথায় নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় মাইলফলক হয়ে থাকবে।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা থেকে বিন্দুমাত্র অবস্থান পরিবর্তন করবেন না। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। এই জনসংখ্যাকে যদি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করা না হয়, তাহলে দেশকে কোনোভাবেই সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ডের সূচনা করেছে সরকার।
সরকারপ্রধান এও জানিয়েছেন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। আগামী মাসের মধ্যে কৃষকদের কাছেও কৃষক কার্ড তুলে দেওয়া হবে। এসব প্রতিশ্রুতি পূরণের মাধ্যমে দেশের ভাগ্য পরিবর্তনই হচ্ছে সরকারের লক্ষ্য। সরকারের এই উদ্যোগগুলো দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবে। আমরা এসব কর্মসূচিকে পারিবারিক-সামাজিক অগ্রগতির সূচক হিসেবে বিবেচনা করছি।
বাংলাদেশের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাটি নতুন। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে এ রকম ব্যবস্থা রয়েছে। সোশ্যাল কার্ড বা হেলথ কার্ডের মাধ্যমে সেসব দেশে নাগরিক সেবা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এই প্রথম এ ধরনের সর্বজনীন সেবা চালু হলো। আমরা আশা করব, ভবিষ্যতে এ রকম সেবামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ জনকল্যাণমূখী রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাবে। দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য যা জরুরি।