মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় দেশে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে সম্ভাব্য ধাক্কা ব্যাংক খাতের সংস্কারকে আরও জটিল করে তোলার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্বল তদারকির ফলে খাতটির ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এ বাস্তবতায় শুরু হওয়া সংস্কার উদ্যোগ এখন কতটা টেকসই হবে, সরকার পরিবর্তনের পর তা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন, আগের সংস্কার উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকবে। কিন্তু ঘোষণার বাইরে গিয়ে এসব সংস্কার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটাই এখন মূল বিবেচ্য।
ব্যাংক খাতের সংস্কার এমন একসময় শুরু হয়েছে, যখন সামষ্টিক অর্থনীতি চাপে আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও আস্থাহীনতার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট। আমরা দেখেছি, অতীতের রাজনৈতিক প্রভাবই ব্যাংক খাতের দুর্বলতার বড় কারণ ছিল। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের আরেক বড় দুর্বলতা খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশ পৌঁছেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলাধীন ঋণ যুক্ত করলে প্রকৃত হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিগত সরকারের সময় তথ্য প্রকাশের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন আনার প্রচেষ্টার বদৌলতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি দীর্ঘদিন তাদের ভোগ্যপণ্য কমাতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাপন করছেন। এ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়েছে। পরিণতিতে দেখা যাচ্ছে প্রবৃদ্ধিতে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে। দ্রুতগতিতে নীতিকৌশলের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার ঝুঁকিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সংস্কার এগিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীরা এখন নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ানোর চিন্তা করছেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে সে উদ্যোগে কিছুটা ভাটা পড়েছে। ফলে বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। তা না হলে পুরো অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে। ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা বাড়াতে হলে আমানতকারীদের যেসব সংকট রয়েছে, তা দ্রুত মীমাংসা করতে হবে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের দ্রুত আইন পাস করে ব্যাংকটিকে ভালোভাবে সচল করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ব্যাংক খাতে বর্তমানে আস্থাহীনতা এবং স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য যেসব সংস্কার উদ্যোগ এই মুহূর্তে জরুরি সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সরকারকে করতে হবে। সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের জন্য ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছে। এখন সেটাকে আইনে পরিণত করতে হবে। ব্যাংক খাতের সংস্কারের জন্য একটি টাইম বাউন্ড অ্যাকশন প্ল্যান বা সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।
ব্যাংকিং খাত সংস্কারের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে আশা করা যায়, ভবিষ্যৎ দুর্নীতির পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক বার্তা। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে তাদের নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আশা করছি, সরকার ব্যাংক খাতের সংস্কারে একটি টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে অর্থনীতির গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।