দেশে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের সাধারণ মানুষ দিশেহারা। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা সংসার চালাতে ধারদেনা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বেশির ভাগ পণ্যের দাম বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের সংকটে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। পণ্যের সরবরাহ কমেছে। ক্রেতাদের অভিযোগ- দাম আরও বাড়তে পারে কিংবা সংকট দেখা দিতে পারে, এমন ভীতি থেকে তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছেন। একশ্রেণির ব্যবসায়ী এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দাম আরও বাড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বাজারে প্রায় সবকিছুর দাম বেড়েছে। দাম যতটা বাড়ার কথা, অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট তার চেয়েও বাড়িয়ে বিক্রি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুত করছে। এতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় পণ্য আটকে রেখে সংকট তৈরি করছে। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, গত মার্চে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে এসেছিল। ফেব্রুয়ারিতে যা ছিল ৯ শতাংশ। সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাজারে সোনালি মুরগির দাম ৫২ শতাংশ বেশি। আর গত এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে বড় বিক্রেতারা বাজারে সোনালি মুরগির দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এদিকে খুচরা দোকানে কেজিপ্রতি খোলা চিনির দাম ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। যা কয়েকদিন আগেও ছিল ৯৫-১০০ টাকা। বাজারে প্রায় দুই মাস ধরে সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট চলছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, গত এক মাসে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম লিটারে ১০-১২ টাকা বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় সবজির দামও চড়া। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন খাতে মানুষের ব্যয় বেড়েছে। গত ২ এপ্রিল ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে কোথাও এ দরে পাওয়া যাচ্ছে না গ্যাস সিলিন্ডার। খুচরা বিক্রেতারা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আমদানি-রপ্তানিতে স্বাভাবিক ধারা নেই। সার, বীজ, কীটনাশকের সরবরাহ কমেছে। জ্বালানি তেলের অভাবে সেচে সমস্যা হচ্ছে। পরিবহন চলাচল কমেছে। এসব কারণে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাজারে পণ্য সরবরাহ কমেছে। চাহিদামতো পণ্য না পাওয়ায় বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে সাধারণ আয়ের মানুষ বেকায়দায় পড়েছে।
দেশে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির করছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। তারা কৃত্রিমসংকট সৃষ্টি করে বাজারব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। যে কারণে বাজারে বিভিন্ন সময়ে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। শুধু অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, সরকারকে আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং সেই সঙ্গে কৃত্রিমসংকট সৃষ্টিকারীদের পূর্ণ নজরদারিতে রাখতে হবে। অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দেশে কতটা পণ্য মজুত রয়েছে সে বিষয়ে ভোক্তাকে জানাতে হবে। এক কথায় ভোক্তা সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকার সাধারণ মানুষের জীবনমানের সুরক্ষায় বাজারব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখবে, এটাই প্রত্যাশা।