স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা, খ্যাতিমান সুরকার ও সংগীত পরিচালক সুজেয় শ্যাম আর নেই। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
গুণী এই সংগীতজ্ঞের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের সংগীতাঙ্গনে। ফেসবুক হয়ে উঠেছে যেন শোকবই। অনেকেই স্মৃতিচারণা করেছেন সুজেয় শ্যামকে নিয়ে। এসব নিয়েই খবরের কাগজের আজকের আয়োজন-
সুজেয় শ্যামদা আমাকে অনেক উৎসাহ দিতেন
নকীব খান
সুজেয় শ্যাম দা আমার বড় ভাই পিলু খানের বন্ধু ছিলেন। সেই সুবাদে আমার সঙ্গে তার অনেক বেশি ভালো সম্পর্ক ছিল। মূলত তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম থেকেই। কারণ একসময় তিনি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে গিটার বাজাতেন। তখন আমার বড় ভাই পিলু খান সেখানে গান করতেন। একসময় তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। এরপর আমাদের বাসাতে আসতেন নিয়মিত। সুজেয় শ্যাম দা আমাকে অনেক উৎসাহ দিতেন। আমার কোনো কাজ ভালো লাগলে প্রশংসা করতেন। আমার কাজ তার সব সময় ভালো লাগত এটা বলতেন। আমাকে অনেক বেশি স্নেহ করতেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অসামান্য একজন সুরকার ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম গানটি ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’ তিনি করেছিলেন। তার মতো একজন সুরকার সংগীত পরিচালকের মৃত্যুতে আমি আসলে কি বলব বুঝতে পারছি না। আমার অনেক খারাপ লাগছে। এমন মানুষের মৃত্যুতে আমরা অভিভাবকশূন্য হয়ে গেলাম। সুজেয় শ্যাম দার জন্য অনেক দোয়া করি। সৃষ্টিকর্তা তাকে যেন স্বর্গবাসী করেন।
শ্যাম দাদা আমরা আপনাকে ভুলব না
কনকচাঁপা
সুজেয় শ্যামের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন নন্দিত কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। তিনি তার ফেসবুকে সুজেয় শ্যামের একটি ছবি প্রকাশ করে শোকবার্তায় লিখেছেন, ‘চলে গেলেন আমাদের সংগীতের আরেক কিংবদন্তি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও সংগঠক সুজেয় শ্যাম।’
কনকচাঁপা আরও লিখেছেন, ‘শ্যাম দাদা, বাংলাদেশকে আপনি অকৃত্রিম হাতে ঢেলে দিয়েছেন। আমরা কখনো আপনাকে ভুলব না। চির কৃতজ্ঞচিত্তে বাংলাদেশ আপনাকে শত বছর মনে রাখবে।’
এ ছাড়া স্মৃতিচারণা করে এই গায়িকা বলেন, ‘সুজেয় শ্যাম বাংলা সংগীতের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। এমন একজন সংগীতজ্ঞের বিদায় খুবই কষ্ট দেয়। ওনার মতো এমন একজন গুণী মানুষের প্রয়াণ আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। সৃষ্টিকর্তার নিকট আমি দোয়া করি তিনি যেন শ্যাম দাদাকে স্বর্গবাসী করেন।’
সুজেয় শ্যাম দাদা সাদামনের মানুষ ছিলেন
ফুয়াদ নাসের বাবু
বাংলাদেশের জন্য সুজেয় শ্যামের যেমন অবদান আছে, তেমনি বাংলাদেশের সংগীতেও তার অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমরা তার অনেক জুনিয়র ছিলাম। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে কখনই বুঝতে দিতেন না। তিনি আমাদের সঙ্গে মন থেকে মিশতেন, আমাদের ভালোবাসতেন। এমন সজ্জন মানুষ খুব কম পাওয়া যায়। সুজেয় শ্যাম সাদামনের মানুষ ছিলেন। তার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি আছে। আলাউদ্দিন আলী, আলম খান, শেখ সাদী খান বলেন, সুজেয় শ্যামের হাত ধরেই আমাদের সংগীতে মূলত পথচলা। তার একটা ভালো গুণ ছিল নিয়মিত ফোন করে খোঁজখবর নিতেন। অসুস্থ হওয়ার পর আর কথা বলতে পারেননি। আমি দেখতে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার চলে যাওয়ার খবর পেলাম। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়েছিলাম শেষ দেখা দেখতে। তাকে হারিয়ে খুব কষ্ট লাগছে। তার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। একবার সাব গেমসের একটি কাজ করছিলেন আলাউদ্দিন আলী এবং শ্যাম দাদা। তখন তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম সহযোগী হিসেবে। প্রায় তিন মাস একসঙ্গে কাজটি করেছি। সে সময় অনেক স্মৃতি জমা হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা তাকে ভালো রাখুক এই দোয়া করি।
শ্যাম কাকা ছিলেন আমাদের পথপ্রদর্শক
বাপ্পা মজুমদার
আমি আসলে শ্যামকাকাকে নিয়ে কি বলব বুঝতে পারছি না। আমি ঘুম থেকে উঠে এমন খবরের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। দেশের জন্য তার যে অবদান সেটা সবাই জানেন। আর গানেও তার অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। তিনি নতুনদের অনেক বেশি উৎসাহ দিতেন। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে অনেক আদর করতেন, ভালোবাসতেন। আমি একবার কাকার করা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’ গানটি নতুন করে সংগীত আয়োজন করেছিলাম। গানটিতে অনেক শিল্পী কণ্ঠ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে কাকাও গেয়েছিলেন। সে সময় গানটি শুনে অনেক প্রশংসা করেছিলেন তিনি। কি যে ভালো লাগা প্রকাশ করেছিলেন সেটা বোঝাতে পারব না। কাকা এভাবে চলে যাবেন ভাবতেও পারিনি। কাকার জন্য অনেক দোয়া। তিনি ওপারে ভালো থাকুন। সৃষ্টিকর্তা যেন কাকাকে ভালো রাখেন এই দোয়া করি।
হাসান