থমকে গেল সুর; থেমে গেছে সব লয়। সাত দশকের সংগীত সাধনার ইতি টেনে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন একাত্তরের কণ্ঠসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা মলয় কুমার গাঙ্গুলী। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
মলয় গাঙ্গুলী সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
এ তথ্য জানিয়ে তবলাশিল্পী পল্লব স্যানাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মিরপুরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে দাদার কিডনি ডায়ালাইসিস চলছিল৷ সেখানেই গতকাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দাদার একমাত্র মেয়ে থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। তিনি দেশে ফিরছেন। তার অনুরোধে দাদার মরদেহ আমরা জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের হিমঘরে রেখেছি। মেয়ে ফিরলে আগামী বৃহস্পতিবার রাজধানীর লালবাগ শ্মশানে মলয় দাদার দাহকার্য সমাপ্ত হবে।’
স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী মলয় গাঙ্গুলীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নেওয়া হবে কি না কিংবা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হবে কি না- তা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
নেত্রকোণার কেন্দুয়ার মোজাফফরপুর গ্রামে ১৯৪৪ সালে জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষটির জীবনজুড়ে ছিল দেশপ্রেম আর সুরের সাধনা।
১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে কণ্ঠকে অস্ত্র বানিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী ও সুরকার মলয় কুমার গাঙ্গুলী। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ি ছাড়েন মলয় কুমার গাঙ্গুলী। তিনি কলকাতায় গিয়ে যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে নিয়মিত গান রচনা, সুরারোপ এবং কণ্ঠ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছেন তিনি।
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে 'পুত্রবধূ' সিনেমায় 'গুরু উপায় বলো না' গানটি গেয়েছিলেন তিনি। পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছিলেন প্রয়াত অভিনেতা প্রবীর মিত্র। সে গানটি মলয় কুমার গাঙ্গুলীকে তখন তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল। তার গাওয়া 'আমার মনতো বসে না গৃহ কাজে সজনী গো', 'অন্তরে বৈরাগীর লাউয়া বাজে'-এর মতো গানগুলো এখনও মানুষের কণ্ঠে শোনা যায়।
মলয় কুমার গাঙ্গুলীর ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক হলো ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের জন্য তৈরি করা ঐতিহাসিক গান 'যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই'৷ তিনি ওই গানে সুরারোপ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় ‘জনতার নৌকা’ অ্যালবামে গানটি অন্তর্ভুক্ত হলে তা সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠে গানটি পুনরায় রেকর্ড করিয়ে নেন। ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মলয় কুমার গাঙ্গুলীকে ২০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছিল।
মৃত্যুুর পরে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মান বা স্বীকৃতির কোনো আবেদন তার নেই, সে কথাও জীবদ্দশায় স্পষ্টভাবে জানিয়ে গেছেন তিনি।
জয়ন্ত সাহা/নাঈম