আলোচনায় যাওয়ার আগে লেখক/প্রকাশক বর্ণিত ‘গল্পসংক্ষেপ’-এর দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। ‘পিতা কী তা নিজে পিতা হওয়ার আগে এ সংসারে কজনই বা বুঝতে পারে। ‘পিতা’ উপন্যাসের মৌলানা শফিকও তা বুঝলেন তিনি যখন পিতা হলেন, কিন্তু ততদিনে বড় বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল।
মৌলানা আহমেদ ফয়েজী আর সাধন কুমার আচার্য দুই হতভাগ্য পিতা। বিধর্মী বিয়ের দায়ে তাদের দুই পুত্র-কন্যাকে তারা সমাজের চাপে ত্যাজ্য করতে বাধ্য হন। কিন্তু পিতার মন। সমাজকে ফাঁকি দিয়ে তারা অনুসরণ করেন পলায়নপর দুই সন্তানকে। তারা চষে বেড়ান দেশে, দেশের বাইরে।
পিতার সঙ্গে সন্তানের ঐশী সম্পর্কের মর্মস্পর্শী বর্ণনা এ উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে অনুরণিত। আর এ অনুরণন হয়েছে ললিত কোমল ভাষার মৃদঙ্গে, হৃদয়হরা প্রকৃতির অনুষঙ্গে এবং অতি অবশ্যই তার সমাপ্তি হয়েছে করুণ রসের লোনাজলে। করুণ কোমল কাহিনির বর্ণনায় এমন হৃদয়ভাঙা ভাষা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হতে যাচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
হ্যাঁ, লেখক/প্রকাশক এমন প্রত্যাশা করতেই পারেন। তেমন গুণাবলি এ উপন্যাসে আছে, সেটাও ঠিক। ভাষার ওপর লেখকের দখল, আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় পটভূমি প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা, বিশেষতঃ ইসলাম ও সনাতন ধর্ম সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন এ গ্রন্থকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। গ্রন্থটি লেখক নিজ পিতাকে উৎসর্গ করেছেন।
উপন্যাসটি সাতটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। প্রথম অধ্যায়ে পাঠক অবগত হবেন মৌলানা আহমেদ ফয়েজী তার মাদ্রাসায় বহু ছেলেকে ইসলামি শিক্ষায় তালিম দিয়েছেন। কিন্তু নিজ পুত্র মৌলানা শফিক ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তার ভাষায় ‘সোজা করতে’ পারেননি। সে কোরআন, হাদিস, ফেকায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছে। গুলিস্তা, বোস্তা, শিকওয়া মুখস্ত করেছে। কিন্তু পাশাপাশি সে পিতৃবন্ধু সাধন কুমার আচার্যের পাঠাগারে দিনের পর দিন অধ্যয়নে ব্যাপৃত থাকে। লুকিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প-উপন্যাস পড়ে। কঠোর শাসনের পরও সিদ্দিক সওদাগরের দোকানে টিভিতে ব্রাজিল-আর্জেন্টিার খেলা দেখতে গিয়ে ধরা পড়ে। এই প্রথাবিরোধী মেধাবী যুবক শফিক মাদ্রাসার খতিবের ছেলে হয়ে হিন্দু ব্রাহ্মণ সাধন কুমার আচার্যের মেয়ে শ্রাবণীকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। ফলে সমাজের চাপে একমাত্র পুত্রকে মৌলানা ফয়েজী ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। আর সাধন কুমার আচার্যকে হিন্দু সমাজ শুধু একঘরে করে ক্ষান্ত হয় না, তার ঘরের দরজায় ও উঠানে কাঁটা বিছিয়ে ‘কাঁটাদুয়ারী’ করে। কিন্তু পিতৃস্নেহের তাগিদে গভীর রাতে দুই বন্ধু পরামর্শ করে, ঝগড়াও করে। মৌলানা বলেন, ‘শুনেছি ওরা ভারতে চলে গেছে। ওই দেশে তো তোমার অনেক চর আছে। শত্রুর ছেলের খবর নাইবা নিলে, পিতা হয়ে নিজের মেয়ের খবর নিলে না, কেমন পাষান পিতা তুমি।’ উত্তরে আচার্য বলেন, ‘তুমি দেওবন্দের ফারেগ। উত্তর প্রদেশের মেওয়াতে তোমার অনেক সাগরেদ আছে শুনেছি। তারা খোঁজ নেয় না কেন?’
দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখা গেল, পলায়নপর দুই সন্তানকে খুঁজতে মেওয়াতে গিয়ে হাজির দুই পিতা। কখনো মুসাফিরখানায়, কখনো মসজিদের দহলিজে আশ্রয় নিয়ে তারা খুঁজে চলেছেন দুই সন্তানকে। তৃতীয় অধ্যায়ে পাঠক দেখবেন, ‘নালহারের অচেনা এক শ্মশানঘাটে বসেছিলেন দুই বৃদ্ধ।’ এখানে জানা যায়, কায়স্ত মেয়ে শ্রাবণীর মাকে বিয়ে করেন ব্রাহ্মণ সন্তান সাধন কুমার এবং এই প্রতিলোম বিয়ের জন্য সপরিবারে একঘরে করা হয় তাকে। যুবক ফয়েজীই, যিনি দেওবন্দে পড়তে গিয়েছিলেন, সাহস করে তাকে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং চাকরি ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। কন্যার সন্ধানে এসে নালহারের বিনাজুড়ী গ্রামে সাধন তার পিতৃ-পরিবারকে খুঁজে পান। বোনের কাছে জানতে পারেন, শ্রাবণী ও শফিক এ বাড়িতেই ছিল। কিন্তু দুই পিতার আগমন সংবাদ পেয়ে তারা ঠাকুর্দার আশীর্বাদ নিয়ে বদরিকা ধামের উদ্দেশে রওনা হয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়ে জানা যাবে, হিমালয়ের পাদদেশে রামচটিতে এসে পৌঁছেছেন তারা। দুপুর নাগাদ তারা পৌঁছলেন হনুমানধামে। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে খুঁজে চলেন তারা নিজ সন্তানদের। ‘তবে এই সন্যাসীদলের মধ্যে এক দম্পতির বিশেষ সুদৃষ্টি আহমেদ ফয়েজীর দৃষ্টি এড়ায়নি।’ কিন্তু পাগড়িঢাকা মস্তক আর ভস্মাচ্ছন্ন মুখ তাদের চিনতে দেয়নি।
পঞ্চম অধ্যায়ে পৌঁছে কাহিনি কাঠামোতে যুক্ত হয় নতুন উপাদান। এর মধ্যে কেটে গেল কয়েক বছর। শফিকের একটি কথা এখানে পাঠকের নজর কাড়ে। শফিক শ্রাবণীকে বলে, ‘ধর্ম আর সমাজ যেহেতু আমাদের ত্যাগ করেছে, চলো আমরাও তাদের ত্যাগ করি।’ এর মাঝে কিছুদিন লক্ষ্ণৌর কাছে উন্নাওতে এক গ্রাম্য মক্তবে শিক্ষকতা করেছে শফিক। কিছুদিন হরিদ্বারের এক মন্দিরে সেবাদাস দাসীর চাকরি করল তারা। কিন্তু ঋষিকেষ ফিরবার পথে লক্ষণঝোলায় শ্রাবণীর মায়ের অবশিষ্ট গয়না হারিয়ে দুজন পথের ফকিরে পরিণত হয়। তার পর ‘ভারত থেকে পালিয়ে মেলাঘর সীমান্ত দিয়ে আলী কদমে (বাংলাদেশে) পৌঁছায় শফিক আর শ্রাবণী।’ সেখানে শঙ্খ নদীর তীরে রূপকানিয়ার মোড়ে শফিকের নতুন জীবন শুরু হয়।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে এসে আমরা জানব, বাড়ি থেকে দূরে এক স্টেশনে ভিখারির ছদ্মবেশে শফিক ও শ্রাবণী নেমেছে বোয়ালভাসা নদীর তীরে নীলমণি গ্রামে নিজ নিজ পিতাকে দেখবে বলে। ইতোমধ্যে তারা খবর পেয়েছে যে আহমেদ ফয়েজী ও সাধন কুমার বহাল তবিয়তে আছে। এভাবে দুজন নিয়ম করে দুই বৃদ্ধ পিতাকে দেখার কাজ অব্যাহত রেখেছে।
সপ্তম ও শেষ অধ্যায়ে এসে পাঠক জানবেন, মৌলানা শফিক নিজে পিতা হতে যাচ্ছেন। হয়তো সে জন্যই হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ল তার। এবং মসজিদে এসে মৌলানা শফিকের হঠাৎ ভুলে যাওয়া মায়ের কথাও মনে পড়ে। গত দুই মাসে ছদ্মবেশে বাড়ির চারপাশে ঘুরে বাবাকে দেখতে যাওয়া হয়নি। শফিকের মনে হয় তার বাবাও এভাবে ছদ্মবেশে এসে দূর থেকে তাদের দেখে যান।
শঙ্খ নদীর তীরে মৌলানা শফিক প্রতিষ্ঠিত ‘আলবিদা’ নামক কবরস্থানের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মৌলানা শফিক যত্নের সঙ্গে মক্তবের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দাফন কাফনের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনের জন্য একটি টিম গড়ে তুলেছেন। এখানে প্রচুর সংখ্যায় লাশ দাফনের আর্জি আসতে থাকে। তাদের দেওয়া হাদিয়ায় মৌলানা শফিক মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা বর্ধিত পাকা গোরস্থান ওয়াকফ করা বিপণিবিতান গড়ে তুলেছেন। আজ এক বিশেষ ব্যক্তির লাশ এসে পৌঁছেছে দাফনের অনুরোধ নিয়ে, সঙ্গে দুটি চিঠি। প্রথম চিঠিতে অনুরোধ করা হয়েছে, পিতৃদত্ত সমস্ত শিক্ষা মোতাবেক যেন মৌলানা শফিক নিজে দাফন সম্পন্ন করেন। এবং দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর যেন একান্তে দ্বিতীয় পত্রটি খোলেন। মৌলানা শফিক সেভাবেই যাবতীয় কর্তব্য সম্পাদন করলেন। ইতোমধ্যে শিশুর কান্নাও শোনা গেছে অর্থাৎ শফিক পিতা হয়েছেন। অতঃপর লাশের দাফন কার্যাদি সম্পাদন শেষে শফিক দ্বিতীয় পত্রটি খুলে পড়লেন। এবং জানলেন যাকে কিছুক্ষণ পূর্বে দাফন করা হয়েছে তিনি ছিলেন মৌলানা শফিকের পিতা মৌলানা আহমেদ ফয়েজী। আরও জানলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে তার প্রাপ্য যাবতীয় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির দলিলপত্র কোথায় রাখা আছে। শ্রাবণীর জন্য তার পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তির দলিলও সেখানে রাখা আছে। অতঃপর সারা দিনের অফুরন্ত ঘনঘটার অবসানে মৌলানা শফিক অবশেষে ‘কাঁদিতে বসিলেন’। উপন্যাসের এখানেই সমাপ্তি।
তাহলে সাতটি অধ্যায়ে বাহাত্তর পৃষ্ঠায় ‘পিতা’ নামে যে উপন্যাসটি পেলাম তার পটভূমি, কাহিনি বিন্যাস, চরিত্রায়ন, সংলাপ, ভাষা শৈলী কি বিশেষ কোনো মানে ও মাত্রায়, রং ও রূপে, অবয়ব ও অন্তর-সম্পদে পাঠকের সামনে হাজির হতে পেরেছে?
পিতা (উপন্যাস)।
লেখক: ফয়েজ তৌহিদুল ইসলাম। প্রকাশক: অন্য প্রকাশ। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। ৭২: পৃষ্ঠা, মূল্য: ২৫০ টাকা।